Sunday , 8 November 2026 |
  1. অনিয়ন ও দুর্নীতি
  2. অপরাধ
  3. অপরাধচিত্র বিশেষ
  4. অর্থনীতি
  5. আইন-আদালত
  6. আন্তর্জাতিক
  7. কক্সবাজার
  8. কিশোরগঞ্জ
  9. কুড়িগ্রাম
  10. কুমিল্লা
  11. কুষ্টিয়া
  12. কৃষি ও প্রকৃতি
  13. ক্রীড়াঙ্গন
  14. খুলনা
  15. খেলাধুলা

মগড়া নদী খনন ও সীমানা নির্ধারণে বিতর্ক, উচ্ছেদ আতঙ্কে দুই পাড়ের বাসিন্দারা

প্রতিবেদক
Newsdesk
November 8, 2026 3:26 pm

১৫৫ কিলোমিটারের নদীতে খনন হবে মাত্র ৪১ কিলোমিটার, ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন; বৈধ জমির মালিকদের হয়রানি না করার দাবি

জাহিদ হাসান, নেত্রকোনা প্রতিনিধি

নদী বাঁচানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছেন নেত্রকোনার মানুষ। তবে সেই উদ্যোগের আড়ালে নিজেদের বসতভিটা ও জমির মালিকানা হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ঐতিহ্যবাহী মগড়া নদীর দুই পাড়ের বাসিন্দারা। নদীর সীমানা নির্ধারণ, খনন পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য উচ্ছেদ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। একই সঙ্গে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর মাত্র ৪১ কিলোমিটার অংশ খননের পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

তাঁদের আশঙ্কা, প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মগড়া নদীর উজান ও ভাটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিয়ে মাঝখানের ৪১ কিলোমিটার খনন করা হলে দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্পের সুফল পাওয়া কঠিন হবে। উজান থেকে নেমে আসা বালু ও পলি পুনরায় খনন করা অংশে জমে নদীর নাব্যতা নষ্ট করতে পারে। এতে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রোববার (৮ নভেম্বর) নেত্রকোনা জেলা প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মগড়া নদীর দুই তীরের বাসিন্দারা এসব উদ্বেগ, অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, ২০২৫ সালের মে মাসে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কয়েকজন কর্মচারী নদী উদ্ধারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে পৌর এলাকার মগড়া নদীতীরবর্তী বসতবাড়ি ও দোকানপাটে গিয়ে সিএস নকশা অনুযায়ী জমি পরিমাপের চেষ্টা করেন। এ সময় সংশ্লিষ্ট জমির মালিকদের আগাম নোটিশ না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভুক্তভোগীরা ২২ মে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে গণস্বাক্ষরসংবলিত আবেদন পাঠান বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

সীমানা নির্ধারণে আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষা

মগড়া নদীর সীমানা নির্ধারণ নিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) দায়ের করা রিট পিটিশন নম্বর ৫১৬১/২০২৫ হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। আয়োজকদের দাবি, নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণে সিএস, আরএস এবং নদীর আদি প্রবাহসহ সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি রিটে উত্থাপিত হয়েছে।

তাঁদের বক্তব্য, নদীতীরবর্তী অনেক পরিবার বিআরএস রেকর্ড অনুযায়ী ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি কিনে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। এসব জমির দলিল, খতিয়ান ও অন্যান্য আইনগত কাগজপত্র যাচাই না করে কেবল পুরোনো সিএস নকশার ভিত্তিতে পরিমাপ কিংবা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হলে নিরপরাধ জমির মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

তাই আদালতের নির্দেশনা, সরকারি আদেশ এবং সীমানা নির্ধারণের জরিপসংক্রান্ত আইনগত ভিত্তি জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জমির মালিকদের যথাযথ নোটিশ প্রদান, তাঁদের বক্তব্য শোনা এবং প্রচলিত আইন অনুসরণ করে সীমানা নির্ধারণের আহ্বান জানান।

৪১ কিলোমিটার খননে ৫০ কোটি টাকা, সুফল নিয়ে সংশয়

সংবাদ সম্মেলনে মগড়া নদীর খনন পরিকল্পনার কারিগরি ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীর মধ্যে মাত্র ৪১ কিলোমিটার খননের পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি প্রায় ১১৪ কিলোমিটার অংশ খননের বাইরে থাকছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, নদীর উজান ও ভাটির অংশে প্রয়োজনীয় খনন ও নাব্যতা পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা না রেখে মাঝখানের অংশ খনন করা হলে উজান থেকে বয়ে আসা বালু-পলি আবারও ওই অংশে জমা হতে পারে। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই নদী পুনরায় ভরাট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে প্রায় ৫০ কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত সুফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।

তাঁদের প্রশ্ন, নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা ও উজান-ভাটির সংযোগ বিবেচনায় না নিয়ে খণ্ডিত খনন পরিকল্পনা কতটা টেকসই হবে? প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এ বিষয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পূর্ণাঙ্গ কারিগরি সমীক্ষা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

গভীর খননে শহরের জনবসতি ও নদীতীরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় নদীর গভীরতা ১ দশমিক ৫ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত বাড়ানোর কথা রয়েছে। তবে এ ধরনের খননকাজের ফলে নদীর দুই পাড়ের মাটি ও অবকাঠামোর ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

বিশেষ করে নেত্রকোনা শহরের সাতপাই, মোক্তারপাড়া, কাটলী ও আরামবাগসহ নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে ভাঙন ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

স্থানীয়দের দাবি, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি শহরের জনবসতি, সড়ক, স্থাপনা ও নদীতীরের স্থিতিশীলতা রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। খননের আগে মাটির গঠন, পানির প্রবাহ, নদীতীরের স্থায়িত্ব এবং সম্ভাব্য ভাঙনঝুঁকি নিরূপণে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও পরিবেশগত সমীক্ষা করা প্রয়োজন।

ওয়াকওয়ে নির্মাণ পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন

নদীকে ঘিরে শহরের সৌন্দর্যবর্ধন ও জনসাধারণের চলাচলের সুযোগ তৈরির বিষয়েও অসম্পূর্ণ পরিকল্পনার অভিযোগ তুলেছেন সংবাদ সম্মেলনের আয়োজকেরা।

তাঁদের বক্তব্য, নেত্রকোনা পৌরসভার মধ্য দিয়ে প্রায় সাত কিলোমিটার প্রবাহিত মগড়া নদীর দুই তীর মিলিয়ে প্রায় ১৪ কিলোমিটার এলাকায় ওয়াকওয়ে নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে। অথচ প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় নদীর প্রতিটি তীরে মাত্র ৮০০ মিটার করে ওয়াকওয়ে নির্মাণের কথা রয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন।

এ অবস্থায় প্রকল্পের মোট ব্যয়, খননের পরিমাণ ও গভীরতা, দরপত্র, কার্যাদেশ এবং ওয়াকওয়ে নির্মাণের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানানো হয়।

বাসিন্দাদের দাবি—নদীও বাঁচুক, মানুষের অধিকারও সুরক্ষিত থাকুক

সংবাদ সম্মেলন থেকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—সিএস, আরএস ও বিআরএসসহ সংশ্লিষ্ট সব ভূমি রেকর্ড যাচাই করে নদীর সীমানা নির্ধারণ; জমির মালিকদের যথাযথ নোটিশ প্রদান ও তাঁদের বক্তব্য শোনা; আদালতের বিচারাধীন বিষয় ও আইনগত নির্দেশনা বিবেচনায় নেওয়া; খনন পরিকল্পনার কারিগরি যৌক্তিকতা পুনর্মূল্যায়ন; সম্ভাব্য ভাঙনঝুঁকি নিরূপণ এবং সরকারি অর্থের অপচয় বা অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনা জেলা প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি ও চ্যানেল আইয়ের নেত্রকোনা প্রতিনিধি সাংবাদিক জাহিদ হাসান, সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল কিবরিয়া হেলিম, প্রেস ক্লাব পরিচালনা কমিটির সদস্য ও দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক শ্যামলন্দ পালসহ অন্যান্য সাংবাদিক। এ সময় মগড়া নদীর দুই তীরের বাসিন্দাসহ প্রায় শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বক্তব্য

এ বিষয়ে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নিয়ম মেনেই প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে। কোনো ব্যক্তির ক্ষতি করা হবে না।

সব মিলিয়ে মগড়া নদীকে দখল, দূষণ ও নাব্যতা সংকট থেকে মুক্ত করার উদ্যোগের পাশাপাশি নদীতীরের মানুষের আইনগত অধিকার, শহরের নিরাপত্তা এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি এখন সামনে এসেছে। নদী পুনরুদ্ধারের প্রকল্প যেন নতুন করে জনভোগান্তি কিংবা আর্থিক অপচয়ের কারণ না হয়—এ প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা, জরিপ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন তাঁরা।

সর্বশেষ - জেলার খবর

আপনার জন্য নির্বাচিত