অপরাধচিত্র ডেস্ক: চীনের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র সাংহাই বিশ্বের গণিতপ্রেমী তরুণদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। আকাশচুম্বী ভবন, সমৃদ্ধ ইতিহাস আর ব্যস্ততম বন্দরের এই মেগাসিটিতে আজ মঙ্গলবার শুরু হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গণিত প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড (আইএমও ২০২৬)।
সাংহাইয়ের ওয়েস্ট বান্ড ইন্টারন্যাশনাল এক্সপো সেন্টারে আজ স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে তিনটায় এক জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠল ৬৭তম আইএমওর। বিশ্বের ১২০টি দেশের ৬৫০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে আয়োজিত হচ্ছে গণিতের এই মহোৎসব।
উৎসবমুখর সাংহাই
সাংহাইয়ের আজকের আবহাওয়া ছিল অনেকটাই আমাদের চেনা ঢাকার মতো, ২৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। চেনা আবহাওয়ায় বিদেশের মাটিতেও দেশের আমেজ খুঁজে পাচ্ছিল বাংলাদেশের লাল-সবুজ প্রতিনিধিদল। দুপুরের মধ্যেই বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের গণিতযোদ্ধারা এসে পৌঁছান অনুষ্ঠান ভেন্যুতে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানস্থল ছিল বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত। স্থানীয় সময় ঠিক বেলা সাড়ে তিনটায় শুরু হয় মূল আয়োজন। ইংরেজি ও চীনা দুই ভাষার চমৎকার সমন্বয়ে চারজন উপস্থাপক পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
ঐতিহ্যবাহী চীনা সংস্কৃতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির এক অনন্য মিশেল দেখা যায় উদ্বোধনী পারফরম্যান্সগুলোয়। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ ছিল বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের বর্ণিল প্রবেশপর্ব। প্রতিটি দেশের শিক্ষার্থীরা নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া নিয়ে ভেন্যুতে প্রবেশ করে। অনুষ্ঠানের শেষ ভাগে সব দেশের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ দেশের জাতীয় পতাকা হাতে যখন মঞ্চে এসে দাঁড়ায়, তখন পুরো হলরুম করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে। লাল-সবুজের পতাকা হাতে আমাদের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের গর্বিত উপস্থিতি গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের নজর কেড়েছে।
বিশ্বমঞ্চে গণিতের তারকারা
এবারের আসরে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ব গণিত অঙ্গনের দিকপালেরা। আইএমও বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক গ্রেগর ডলিনার তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যে অংশগ্রহণকারীদের স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ‘গণিত অলিম্পিয়াডের মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সমস্যা সমাধানের আনন্দের মধ্যে। এখানে এসে পৌঁছানোই প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য অনেক বড় অর্জন। তোমাদের সামনে যে গাণিতিক সমস্যাগুলো আসবে, তা কেবল পরীক্ষা নয়, তোমাদের সৃজনশীলতা প্রকাশের একটি চমৎকার সুযোগ।’
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন আইএমও বোর্ডের সেক্রেটারি জেনারেল রিয়া ভ্যান হাফেল। এ ছাড়া স্বাগতিক দেশের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন চায়নিজ ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির সভাপতি ও চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সের সম্মানিত সদস্য জি নানহুয়া এবং চায়না অ্যাসোসিয়েশন ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ভাইস প্রেসিডেন্ট মো জেইয়াও। চীন ছাড়াও বিশ্বের নামকরা বহু গণিতবিদ, বিজ্ঞানী এবং শিক্ষাবিদ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
জমকালো সাংস্কৃতিক পর্ব :দুই ঘণ্টা ১৫ মিনিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শেষভাগে আয়োজিত জমকালো সাংস্কৃতিক পর্বটি উপস্থিত সবাইকে দারুণভাবে মুগ্ধ করে। চীনের হাজার বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে মঞ্চে আসে একদল চীনা কিশোর। তারা অত্যন্ত নিখুঁত ও নান্দনিক ভঙ্গিমায় পরিবেশন করে চীনের ঐতিহ্যবাহী নাচ। এর পরপরই মঞ্চ কাঁপিয়ে পরিবেশিত হয় রোমাঞ্চকর মার্শাল ড্যান্স, যেখানে মার্শাল আর্টের ক্ষিপ্র গতিময়তার সঙ্গে নাচের নান্দনিক ছন্দের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে।
ঐতিহ্যবাহী বর্ণিল পোশাকে কিশোরদের এই বীরত্বগাথা ও শারীরিক কসরত পুরো হলরুমকে করতালিতে মুখর করে তোলে। সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পর ভৌগোলিক সীমানা ভুলে বিশ্বভ্রাতৃত্বকে একসুতোয় গেঁথে বন্ধুত্বের আহ্বান জানিয়ে শেষ হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
লাল-সবুজের ছয় গণিতযোদ্ধা :বাছাই, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্ব এবং পরবর্তী কঠোর ক্যাম্পিংয়ের পর চূড়ান্ত হয় বাংলাদেশ দল। দলের ছয় সদস্য হলেন ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মনামী জামান, ঢাকা ইম্পেরিয়াল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জাওয়াদ হামীম চৌধুরী, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের এসএসসি পরীক্ষার্থী এম জামিউল হোসেন, চট্টগ্রাম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. রায়হান সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মারজুক রহমান এবং ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহসিন খান। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈশ্বিক আসরে দলনেতা হিসেবে আছেন কোচ মাহবুবুল আলম মজুমদার, উপদলনেতা হিসেবে আছেন একাডেমিক সমন্বয়ক অপূর্ব কুমার এবং পর্যবেক্ষক হিসেবে আছেন সমন্বয়ক মো. বায়েজিদ ভূঁইয়া।
দুই দিনের কঠিন পরীক্ষা : উদ্বোধনী উৎসবের আমেজ শেষ হতেই শুরু হচ্ছে আসল লড়াই। আগামীকাল ১৫ জুলাই এবং পরশু ১৬ জুলাই এই দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে আইএমওর মূল পরীক্ষা। প্রতিদিন সাড়ে চার ঘণ্টার এই পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের সমাধান করতে হবে তিনটি করে মোট ছয়টি গাণিতিক সমস্যা। মেধার ভিত্তিতে অংশগ্রহণকারী বিজয়ীদের সোনা, রুপা ও ব্রোঞ্জপদকে ভূষিত করা হয়। মেধার এই আন্তর্জাতিক মহাযুদ্ধে বাংলাদেশের খুদে গণিতবিদদের হাত ধরে নতুন কোনো গৌরবগাথা রচিত হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৫৯ সালে রোমানিয়ায় শুরু হয়েছিল বিশ্বের প্রাক্-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়ুয়াদের মেধার লড়াই আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড। বাংলাদেশ ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের সদস্যপদ পায়। বাংলাদেশ দল এবার ২২তম বারের মতো আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে এখন পর্যন্ত ১টি স্বর্ণপদক, ৭টি রৌপ্যপদক, ৪০টি ব্রোঞ্জপদক ও ৪৭টি সম্মানজনক স্বীকৃতি লাভ করেছে বাংলাদেশ।
উল্লেখ্য, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসির পৃষ্ঠপোষকতায় এবং প্রথম আলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দেশব্যাপী গণিত অলিম্পিয়াড আয়োজন করা হয়। সেখান থেকেই ৬৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য বাংলাদেশের দল নির্বাচন করা হয়েছে। দল নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

















