Tuesday , 15 September 2026 |
  1. অপরাধ
  2. অপরাধচিত্র বিশেষ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. কক্সবাজার
  7. কিশোরগঞ্জ
  8. কুড়িগ্রাম
  9. কুমিল্লা
  10. কুষ্টিয়া
  11. কৃষি ও প্রকৃতি
  12. ক্রীড়াঙ্গন
  13. খুলনা
  14. খেলাধুলা
  15. গাইবান্ধা

খাদ্যগুদাম ঘিরে অদৃশ্য সিন্ডিকেট কৃষক বঞ্চিত, মিলার-ডিলার-দালালদের দাপটের অভিযোগ

প্রতিবেদক
Newsdesk
September 15, 2026 1:38 am

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি খাদ্যগুদামে ধান-চাল সংগ্রহের উদ্দেশ্য ছিল কৃষকের উৎপাদিত শস্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অভিযোগ বলছে, সেই ব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখন মধ্যস্বত্বভোগী, মিলার, ডিলার ও প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে। ফলে সরকারি দামে সরাসরি গুদামে ধান দেওয়ার সুযোগ থেকে অনেক প্রকৃত কৃষক পিছিয়ে পড়ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কোথাও দালালের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ, কোথাও ভাড়ার মিল ব্যবহার করে সরকারি সরবরাহ, আবার কোথাও কৃষকের পরিচয় ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে কাগজে-কলমে সংগ্রহ দেখানোর মতো অনিয়ম চলছে। এসব ঘটনায় খাদ্য বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

মিল নেই, তবু সরকারি সরবরাহে নাম:

বিভিন্ন এলাকার তথ্য ও অভিযোগে উঠে এসেছে, তালিকাভুক্ত মিলারের একটি অংশের নিজস্ব চালকল বা চাতাল নেই। অন্যের মিল কিংবা ভাড়ায় নেওয়া মিল ব্যবহার করে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
রংপুর, নওগাঁ ও রাজশাহীসহ কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তালিকাভুক্ত মিলারদের উল্লেখযোগ্য অংশের নিজস্ব অবকাঠামো নেই। এরপরও তারা সরকারি খাদ্যশস্য সরবরাহের সুযোগ পাচ্ছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এর পেছনে স্থানীয় পর্যায়ের একটি শক্তিশালী যোগাযোগব্যবস্থা কাজ করছে।

কৃষকের বদলে দালালের দখল:

সরকারি গুদামে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার বিধান থাকলেও অনেক এলাকায় বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে অভিযোগ। কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে দালাল বা ফড়িয়ারা পরে সরকারি ব্যবস্থায় তা সরবরাহ করছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে একাধিক অঞ্চলে।
এতে কৃষক ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের সরাসরি কৃষক-ভিত্তিক সংগ্রহ ব্যবস্থার উদ্দেশ্যও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

তালিকা ও মোবাইল নম্বর নিয়েও প্রশ্ন:

কয়েকটি খাদ্যগুদামের কৃষক তালিকা যাচাই নিয়ে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। কোথাও একই মোবাইল নম্বর একাধিক কৃষকের নামে ব্যবহারের অভিযোগ, কোথাও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে তালিকার অসংগতি পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে অন্যদের নাম ব্যবহার করে সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য এসব অভিযোগ যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

বরিশালে কালোবাজারির অভিযোগ:

বরিশালের খাদ্য সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থাকে ঘিরে উঠেছে আরও গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয় সূত্রের দাবি, গুদাম থেকে চাল, গম ও আটা ছাড়ের পর নির্ধারিত পরিমাণের একটি অংশ সরাসরি বাজারে না গিয়ে অন্য পথে বিক্রি হচ্ছে।
অভিযোগে গুদামের কর্মচারী, ডিলার ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে। এমনকি গুদামে পণ্য ওঠানো-নামানোর সময় বস্তা ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করেও চালের ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।
তবে বরিশাল সদর উপজেলার খাদ্য কর্মকর্তা আবু সাইদ কালোবাজারে খাদ্যশস্য বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, প্যাকিং বস্তায় পণ্য আসে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় তা খালাস করা হয়। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

রাজশাহীতে নিম্নমানের চালের অভিযোগ:

রাজশাহী অঞ্চলেও খাদ্যগুদাম ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। বাগমারার ভবানীগঞ্জ খাদ্যগুদামে নিম্নমানের চাল মজুতের ঘটনায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে।
মোহনপুরে নিজস্ব লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও অন্য মিলের লাইসেন্স ব্যবহার করে ধান থেকে চাল তৈরি ও সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে। দুর্গাপুরে খাওয়ার অনুপযোগী চাল শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছিল। এসব ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ্যে না আসায় প্রশ্ন রয়ে গেছে।

খুলনায় ওজন ও বস্তা নিয়ে অভিযোগ:

খুলনা অঞ্চলের খাদ্যগুদামগুলোতেও নিম্নমানের শস্য, পুরোনো বস্তা ব্যবহার এবং ওজনে কারচুপির অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি নির্দেশনায় নতুন বস্তা ব্যবহারের কথা থাকলেও কোথাও পুরোনো বা ছেঁড়া বস্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
খুলনা সদর গুদামে ৫০ কেজির বস্তায় নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম চাল দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ট্রাক ওজন, তল্লাশি এবং পণ্য ওঠানো-নামানোর বিভিন্ন পর্যায়ে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

নড়াইলে দালাল ছাড়া ধান দেওয়া কঠিন?

কালিয়ার যাদবপুরসহ কয়েকটি এলাকার কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে গেলে দালালের সহায়তা প্রয়োজন হয়। কৃষকদের দাবি, মধ্যস্বত্বভোগীদের বাইরে গিয়ে সরাসরি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ পাওয়া কঠিন।
তবে জেলা খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নড়াইলে কোনো সিন্ডিকেট থাকার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

মেহেরপুরে ‘স্লিপ’ নিয়ে অভিযোগ:

মেহেরপুরে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দেওয়া স্লিপের মাধ্যমে কৃষকদের গুদামে ধান সরবরাহ করতে হয়েছে—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কৃষকদের একটি অংশের দাবি, স্লিপ না থাকলে সরকারি দামে ধান বিক্রির সুযোগ পাওয়া যায়নি। খাদ্য বিভাগের বক্তব্য, শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কিছু ক্ষেত্রে স্লিপ ব্যবহার করা হলেও অধিকাংশ ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে।

বাগেরহাটেও থামেনি অভিযোগ:

সরকার পরিবর্তনের পরও বাগেরহাটের বিভিন্ন খাদ্যগুদাম ঘিরে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।
তাদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের বাইরে থেকে সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করা কঠিন। একই সঙ্গে টিআর, কাবিখা, কাবিটা ও ওএমএসের চাল বিতরণে ওজন কম দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

চুয়াডাঙ্গায় অতিরিক্ত ধান দেওয়ার অভিযোগ,:

সরোজগঞ্জ এলাকার কয়েকজন কৃষকের অভিযোগ, সরকারি গুদামে ধান সরবরাহের সময় নির্ধারিত পরিমাণের অতিরিক্ত ধান দিতে হয়। প্রতি মণে অতিরিক্ত ধান নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।
ধানের আর্দ্রতা বা মান নিয়ে আপত্তি থাকলেও অর্থের বিনিময়ে তা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে।

কুষ্টিয়ায় নিয়ন্ত্রণ বদলের অভিযোগ:

কুষ্টিয়ার খাদ্যগুদাম নিয়েও উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ। স্থানীয় অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের প্রভাব থাকলেও বর্তমানে স্থানীয় বিএনপি-ঘনিষ্ঠ কিছু নেতার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কুষ্টিয়া শহরের বড় বাজার এলাকার সরকারি খাদ্যগুদাম নিয়েও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।

রংপুরে মিলবিহীন সরবরাহকারী:

রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় খাদ্য সংগ্রহ ব্যবস্থায় মিলার ও দালালদের প্রভাবের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কাউনিয়া ও মিঠাপুকুরে এমন চাতালের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। আবার নিজস্ব মিল-চাতাল না থাকা ব্যক্তির নামও সরবরাহকারীর তালিকায় থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু সরবরাহকারী নিজেদের নামে পাওয়া বরাদ্দ অন্য ব্যবসায়ীর কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করে দেন। আর দালালরা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে সরকারি ব্যবস্থায় সরবরাহ করে লাভবান হচ্ছেন।

কুড়িগ্রামে বস্তাসংকট দেখিয়ে অন্যত্র ধান?

কুড়িগ্রামের রাজারহাটে কৃষকদের অভিযোগ, গুদামে বস্তার সংকট দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে ধান নেওয়া হয়নি। পরে অটো রাইস মিলে ধান দেওয়ার জন্য টোকেন দেওয়া হয়েছে।
সেখানে সরকারি কর্মকর্তার উপস্থিতি না থাকার সুযোগে ধানের পরিমাণ কমিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

দিনাজপুরে একই নম্বরে একাধিক কৃষক?

হাকিমপুরের খাদ্যগুদামে কৃষক তালিকা, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর নিয়ে অসংগতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই মোবাইল নম্বর একাধিক কৃষকের নামে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, তালিকা নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রকৃত কৃষকের বড় একটি অংশ সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেননি। তবে খাদ্য বিভাগ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
শুধু সরকার বদলালেই কি বদলায় সিন্ডিকেট?
বিভিন্ন জেলার অভিযোগ পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—খাদ্য সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রভাবশালী মহলের আধিপত্যের অভিযোগ রয়েছে।
কৃষকের নামে বরাদ্দ, মিলারের সক্ষমতা, গুদামের মজুত, ওজন, বস্তা, পরিবহন এবং বিতরণ—প্রতিটি ধাপেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে একই ধরনের অভিযোগ বারবার ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যায়।

টিআইবির উদ্বেগ:

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, খাদ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের প্রভাব থাকলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।
তিনি বলেন, সরকারি খাদ্য মজুত ও বিপণন ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা জরুরি।

সর্বশেষ - জেলার খবর

আপনার জন্য নির্বাচিত