অপরাধচিত্র ডেস্ক: বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতু সংযোগ সড়ক না থাকায় দেড় বছর ধরে পড়ে আছে। সেতুটি দিয়ে কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে আটকে গেছে ওই সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ। এতে ভোগান্তি পোহাচ্ছে স্থানীয় মানুষ।
উজিরপুর উপজেলার উত্তর ধামুরা খালের ওপর সেতুটি নির্মিত হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। সংযোগ সড়ক হলে ধামুরা-শোলক-বাটাজোর সড়কে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। সংযোগ সড়ক না থাকায় পাশের আগৈলঝাড়া উপজেলার রত্মপুর, উজিরপুরের শোলক, বামরাইল, গৌরনদীর মাহিলারা ইউনিয়নের বাসিন্দারা এ সড়কে যাতায়াত করতে পারছেন না।
উজিরপুর উপজেলার শোলক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সান্টু মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, সেতুটি চালু হলে দুই পারের অন্তত এক লাখ মানুষের সড়ক যোগাযোগে ভোগান্তি কমবে।
এলজিইডির উজিরপুর উপজেলা প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উত্তর ধামুরা খালের ওপর নির্মিত ৪৪ দশমিক শূন্য ৬ মিটার দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার (সিমেন্ট, বালু, পাথর ও রডের তৈরি কাঠামো) সেতুটির চুক্তিমূল্য ৬ কোটি ৮৩ লাখ ৩৯ হাজার ৫৩৫ টাকা। গ্রামীণ সেতু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ২০২৩ সালের ১৭ জুলাই সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। মূল সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। সেতুটির নির্মাণকাজ করে এমএস বসুন্ধরা ও সুপ্তি নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সংযোগ সড়কের অভাবে সেতুটি চালু হয়নি।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত নকশায় সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক রয়েছে। তবে জমির মালিকানা জটিলতায় সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ ঝুলে গেছে।
এলজিইডির উজিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী সুব্রত রায় বলেন, সেতুর ঢাল নামানোর জন্য প্রায় ৩৪ ফুট খাসজমি আছে। তবে ওই জমির ব্যবহার নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের বিরোধে কাজ আটকে আছে। প্রকল্প গ্রহণের আগে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জমির মালিকানা যাচাই করা হয়েছিল। এরপর নকশা অনুমোদন নিয়ে দরপত্রের মাধ্যমে কাজ করা হয়। বর্তমানে কিছু মানুষের ‘অযৌক্তিক বাধা’র কারণে সংযোগ সড়কের কাজ বন্ধ রয়েছে।
সেতু চালু না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ হচ্ছে সাধারণ মানুষের। স্থানীয় বাসিন্দা এনায়েত শরীফ বলেন, এটি উপজেলা পরিষদের নিবন্ধিত সড়ক। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সড়কের জমি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেই নকশা করা হয়েছে। এরপরই সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
সেতুর পূর্ব পাশে উত্তর ধামুরা অংশে দুই শতক জমির মালিকানা দাবি করা স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রব হাওলাদার বলেন, এসএ খতিয়ান (পূর্ব পাকিস্তান আমলে প্রস্তুত করা জমির রেকর্ড বা পরচা) অনুযায়ী ওই জমির মালিক তিনি। সেতু নির্মাণের সময় তাঁর জমির ওপর দিয়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণে তিনি আপত্তি জানিয়েছিলেন। প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা না করেই জমি ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা তিনি মেনে নেবেন না। জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে উত্তর ধামুরা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেতুটির পূর্ব প্রান্তে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে সেতুর ওপরে উঠছেন পথচারীরা। পশ্চিম প্রান্তে বালু ফেলে রাখা হয়েছে। সেতুর ওপর ইট স্তূপ করে রাখা। সেতুটি দিয়ে যানবাহন চলাচলের উপায় নেই। সেখানে কথা হয় মনির হোসেন নামের এক পথচারীর সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সংযোগ সড়ক না থাকায় কৃষকের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতেও ভোগান্তি হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহেশ্বর মণ্ডল বলেন, এলজিইডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বর্তমান বিএস জরিপে (বাংলাদেশ সার্ভে) ওই জমি সড়কের নামে রেকর্ড ও নকশা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।
এত টাকা খরচ করে জনগণের সুবিধার জন্য যে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে, সেটি দেড় বছরেও চালু না হওয়াটা দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) উজিরপুর উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান।


















