Wednesday , 29 July 2026 |
  1. অপরাধ
  2. অপরাধচিত্র বিশেষ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. কক্সবাজার
  7. কিশোরগঞ্জ
  8. কুমিল্লা
  9. ক্রীড়াঙ্গন
  10. খুলনা
  11. খেলাধুলা
  12. গাইবান্ধা
  13. গাজীপুর
  14. চট্রগ্রাম
  15. চাকরি

প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ থেকে মব ভায়োলেন্স: বিতর্কের শীর্ষে রাকসু জিএস আম্মার

প্রতিবেদক
Newsdesk
July 29, 2026 9:13 pm

অপরাধচিত্র ডেস্ক:  জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সালাহউদ্দিন আম্মারের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের শুরুটা রাকসুর জিএস নির্বাচিত হওয়ারও আগে থেকেই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক থাকাকালীনই পোষ্য কোটা আন্দোলনে সাবেক উপ-উপাচার্যকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন।

এরপর শিক্ষার্থীদের বিপুল ভোটে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হওয়ার পর সেই ধারা থামেনি, বরং দায়িত্ব পাওয়ার পর গত এক বছরে একের পর এক বিতর্কে জড়িয়েছেন তিনি।

আন্দোলনের নায়ক থেকে যিনি ছাত্র রাজনীতির অন্যতম আলোচিত মুখ হয়ে ওঠেন, তার দায়িত্বকাল এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে ক্ষমতার অপব্যবহার, উগ্র আচরণ, নৈরাজ্য, সহিংসতা, আর্থিক অস্বচ্ছতা ও একাধিক বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগ। এমনকি সরাসরি জড়িয়েছেন মব সন্ত্রাসের মতো নৃসংশ ঘটনাতেও। সাবেক এক পঙ্গু ছাত্রলীগ নেতাকে নৃসংশ কায়দায় পিটিয়ে হত্যার দায়ও এখন তার কাঁধে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম সালাহউদ্দীন আম্মার।

রাকসুর আগেই বিতর্কের শুরু: সাবেক উপ-উপাচার্যকে লাঞ্ছিত

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, রাকসুর জিএস নির্বাচিত হওয়ারও প্রায় এক মাস আগে, পোষ্য কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র আন্দোলন শুরু হলে সমন্বয়ক হিসেবে সামনের সারিতে থাকা আম্মারের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাঈন উদ্দীনের গাড়ি ঘেরাও করেন এবং পরে জুবেরী ভবনে অবস্থানরত উপ-উপাচার্য ও প্রক্টরসহ কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ রাখেন। এ সময় শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। পরে সমালোচনার মুখে আম্মার সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিক্ষকেরা পিতৃতুল্য, তাদের গায়ে হাত তোলা হয়নি।’

এখতিয়ারবহির্ভূত হস্তক্ষেপের অভিযোগ

জিএস হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে ঘন ঘন যে অভিযোগটি উঠেছে তা হলো, আম্মার নিজের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা প্রশাসনিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে তার বিরুদ্ধে অশালীন আচরণ ও হুমকির মাধ্যমে শিক্ষকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির অভিযোগ তুলে তীব্র নিন্দা জানায়। তৎকালীন ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক মো. আবদুল আলীম ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মাদ আমীরুল ইসলাম যৌথ বিবৃতিতে এই আচরণকে ক্যাম্পাসে নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টিকারী বলে আখ্যা দেন। একই ধারাবাহিকতায় অভিযোগ রয়েছে, তিনি ডিনদের পদত্যাগপত্র হাতে নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনেই একে একে তাদের ফোন করেছিলেন। দৃশ্যটি রাকসু ভবনের সামনে ক্যামেরায় ধরা পড়লে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

ডাকসু নেত্রীর পোস্টে বিতর্কিত মন্তব্য

গত মে মাসে আম্মার নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েন একটি ফেসবুক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা এক পাকিস্তানি শিক্ষার্থীর সঙ্গে ছবি দিয়ে পোস্ট দিলে সেখানে আম্মার মন্তব্য করেন, ‘নিয়ে আসেন আমার জন্য।’ মন্তব্যের স্ক্রিনশট দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক নিন্দার ঝড় ওঠে। ছাত্রদল তাকে ‘উন্মাদ’ আখ্যা দিয়ে মানসিক চিকিৎসার দাবি জানায় এবং মন্তব্য করে, তিনি জিএস পদের উপযুক্ত নন।

তারেক রহমান সংক্রান্ত ব্যঙ্গচিত্র বিতর্ক

এপ্রিল মাসে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের প্রতিবাদে খুলনার কয়রা উপজেলায় বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং আম্মারকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ঝাড়ুমিছিল ও কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। ক্যাম্পাসের গন্ডি পেরিয়ে এই বিতর্ক জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

৭৬ লাখ টাকার অনুদান বিতর্ক

গতবছর জুলাইয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয় অর্থ সংগ্রহের একটি উদ্যোগ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘জুলাই ৩৬: মুক্তির উৎসব’ কনসার্ট আয়োজনের জন্য আম্মার ৭০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট ৭৬ লাখ টাকা চেয়ে চিঠি পাঠান। এই উদ্যোগ ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, অনুদানের নামে কার্যত চাঁদা দাবি করা হয়েছে। একজন ছাত্রনেতা ব্যক্তিগতভাবে এত বড় অঙ্কের অর্থ কীভাবে ও কোন এখতিয়ারে চাইতে পারেন এবং সংগৃহীত অর্থের হিসাব প্রকাশ্যে আসবে কিনা, তা নিয়ে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন ওঠে ।

সাবেক উপাচার্যকে নিয়ে নিজ কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি

এবছরের মার্চ মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীবের বিদায়ের সময় আম্মার নিজেই আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় স্বীকার করেন, ‘ভিসির গেটে যত লাথি মারা হয়েছে, যতবার এই মানুষটাকে বিপদে ফেলেছি, আমি হয়তো তার জীবনের ছাত্র নামের এক আপদ হিসেবেই ছিলাম।                                                 সর্বশেষ বড় বিতর্কের জন্ম দেয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে মারধরকাণ্ড

আম্মারকে ঘিরে সাম্প্রতিক ও সবচেয়ে গুরুতর বিতর্কটি তৈরি হয় গত সোমবার (২৭ জুলাই) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারকে কেন্দ্র করে। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ঢুকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক এক কর্মীসহ তিন শিক্ষার্থীকে বেধড়ক মারধর করেন আম্মার ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। প্রক্টর দপ্তর ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে দফায় দফায় এই মারধরের ঘটনা ঘটে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আম্মার দাবি করেন, ঘটনার শুরুটা উল্টো দিক থেকে হয়েছে তাদেরই রাকসু ভবনে গিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা মারধর করেছে।

কী বলছেন ছাত্র নেতারা

ছাত্র অধিকার পরিষদ রাবি শাখার সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, সালাউদ্দিন আম্মার একটি শিবিরের তৈরি একটা ক্যারেক্টার। তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তাকে ব্যবহার করে থাকে। এই ছেলেটা একদিনে লাগামহীন হয়নি। লাগাতার তার বিভিন্ন মববাজির বিচার হয়নি বলেই, আজকে বিষয়টি এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। এর দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এড়াতে পারে না। তবে, এসব বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ এবং বিরক্ত। এগুলো শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তো নষ্ট করবে বটেই, সেইসঙ্গে রাবির সম্মান দিনদিন তলানিতে নিয়ে যাবে। আমি মনে করি, তার দ্বারা আজ পর্যন্ত যতগুলো বিশৃঙ্খল ঘটনা ঘটেছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে যথাযথ শান্তির ব্যবস্থা করা। তা না হলে, এই প্রবণতা অন্যদেরকেও প্রভাবিত করবে এবং মবের সংস্কৃতি চলতেই থাকবে।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ফুয়াদ রাতুল বলেন, রাকসুর নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে শিক্ষক লাঞ্ছনা, ব্ল্যাকমেইলিং, মব ভয়লেন্সের সঙ্গে জড়িত হচ্ছেন। এ ধরনের কাজ সারা দেশে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে। সর্বশেষ জিএস সালাউদ্দিন আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বিরসহ শিবিরের প্রথম সারির নেতৃবৃন্দ কর্তৃক তিন শিক্ষার্থীর ওপর হামলার ঘটনায় ক্যাম্পাসে ভয়ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ফৌজদারি অপরাধ। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এই অপরাধের কঠোর শাস্তি দাবি করি।

যা বলছেন আম্মার ও শিবির

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, আমি যেসব কাজ করেছি, পোষ্য কোটা থেকে রেললাইন অবরোধ- সবকিছুই শিক্ষার্থীদের স্বার্থে, এখানে আমার নিজের কোনো স্বার্থ নেই। লাইব্রেরিতে মারধরের যে ঘটনা সেটা প্রথম ওরা (ছাত্রলীগ) আমাদের রাকসু ভবনের মারধর করে ভিডিও করেছে। সেটার একটা প্রতিরোধ হিসেবে আমি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি। মিডিয়ায় যেভাবে এসেছে ৭৬ লাখ টাকার যে বিতর্ক, সেখানে আসলে টাকা উঠেছে মাত্র আড়াই লাখ। আমি এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে কাজ করছি, কিন্ত আমার কোনো কাজ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে না।

আম্মারের কার্যক্রমে শিবিরের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্র শিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, সালাউদ্দিন আম্মারের কোনো কর্মকাণ্ডের দায় শিবির নেবে না। রাকসুর আম্মারের সঙ্গে ছাত্র শিবিরের কোনো সম্পৃক্ততার নেই। তিনি শিবির হলে, শিবিরের প্যানেলেই রাকসু নির্বাচন করত। এই প্রশ্নের সমাধান রাকসু নির্বাচনের সময়েই হয়ে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) আব্দুল আলীম বলেন, গত ২৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ঘটনা ঘটেছে সেটাসহ এই ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি হবে। আমরা ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি করেছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলেছি। প্রতিবেদনে অনুযায়ী যারাই জড়িত থাকবে তাদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হবে, সেই যেই হোক।

 

সর্বশেষ - রাজনীতি