নিজস্ব প্রতিবেদক, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গ্যাস-সংকটের মধ্যে সক্ষমতার অর্ধেকও উৎপাদন করা যাচ্ছে না। চাহিদা পূরণ করতে না পারায় তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হচ্ছে। আর অলস বসে বসে ভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) নিচ্ছে অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের টানাটানিতে নিয়মিত কষ্ট পাচ্ছে মানুষ।
গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় গ্যাসের সংকট বেড়ে গেছে। এতে সারা দেশে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে উৎপাদন কমেছে। গ্যাসের অভাবে রান্না করতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি। গতকাল রোববার পর্যন্ত টার্মিনাল চালুর কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। আরও কিছুদিন ভুগতে হতে পারে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র বলছে, চুক্তি অনুসারে প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে কেন্দ্র ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক; এটি দিতেই হবে। সরকারি-বেসরকারি মিলে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৭টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ভাড়া নিয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। প্রতিবছর এটি বাড়ছে। অথচ পাঁচ বছর ধরে গরম বাড়লেই লোডশেডিংয়ে ভুগতে হচ্ছে মানুষকে।
বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। ফলে প্রতিবছর বড় সময় অলস বসিয়ে রাখতে হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র। দিতে হয়েছে অলস কেন্দ্রের ভাড়া।
দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। গত জুনে আরেক দফা বেড়েছে পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম। সরকারের ভর্তুকিও বাড়ছে। নিয়মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল পরিশোধ করতে পারছে না পিডিবি। পিডিবির বকেয়া প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ঘাটতি
দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ আছে। এতে দিনে গ্যাস সরবরাহ ২১৫ কোটি ঘনফুটে নেমে গেছে। টার্মিনাল চালু হলে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ হতে পারে। যদিও দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এর মধ্যে স্বাভাবিক সময়ে ছয় হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি উৎপাদন করা হতো। এটি এখন চার হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে গেছে। তার মানে গ্যাস থেকেই উৎপাদন কমেছে দুই হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে গত শনিবার থেকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে গেছে পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট। এতে কেন্দ্রটি থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। ৮ থেকে ১০ আগস্টের মধ্যে এটি আবার উৎপাদনে ফেরার কথা রয়েছে। বড়পুকুরিয়ায় দেশীয় কয়লা থেকেও উৎপাদন হচ্ছে কম, তিনটির মধ্যে দুটি ইউনিট বন্ধ আছে কারিগরি কারণে।
তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াটের মতো উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে পিডিবির লোকসান বাড়ে। তাই জরুরি প্রয়োজনে শুধু রাতের বেলায় চালাতে চায় পিডিবি। যদিও এখন দিনের বেলায় দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ও সন্ধ্যার পর থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা হচ্ছে। তবে রাত ১১টার পর থেকে আবার উৎপাদন কমতে থাকে। এতে মধ্যরাতের পর লোডশেডিং বেড়ে যায়।
গত শনিবার রাত ১২টায় সারা দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৬৭৪ মেগাওয়াট। একই সময়ে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এলাকায় লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৩৪২ মেগাওয়াট। ওই সময় গড়ে ২৪ শতাংশ ঘাটতি ছিল আরইবির। শনিবার রাত ৯টায় মোট লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৭২ মেগাওয়াট। একই সময়ে আরইবি লোডশেডিং করেছে ১ হাজার ৮০৮ মেগাওয়াট। তবে গত কয়েক দিনে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে শনিবার রাত তিনটায়, ৩ হাজার ১৪ মেগাওয়াট। গতকাল রোববার দিনের বেলাতেও সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে সকাল ৯টায় ২ হাজার ৭৮৬ মেগাওয়াট। বৃষ্টি না হলে রাতে এটি আরও বাড়তে পারে।
পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, গ্যাসের সরবরাহ অনেক কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ-চালিত চুলার ব্যবহার বেড়েছে। গরম আবহাওয়া, বৃষ্টিও হচ্ছে না। এতে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। তেলচালিত কেন্দ্র থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উৎপাদন করেও চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। সর্বোচ্চ সরবরাহের চেষ্টা চলছে।
ঢাকার বাইরে ভোগান্তি বেশি
দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার সহজপুর সেনপাড়া এলাকার বাসিন্দা হরবালা সেন বলেন, দিনরাত মিলিয়ে সাত-আটবার বিদ্যুৎ যাচ্ছে। একবার গেলে এক-দেড় ঘণ্টা পর আসে। ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে চরম ভোগান্তিতে আছেন।
দিনাজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপব্যবস্থাপক (কারিগরি) সীমা রানী কুন্ডু বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। এলাকাভেদে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা করে কয়েকটি ফিডারে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
ঢাকার সাভারের ১ নম্বর ওয়ার্ডের জাহাঙ্গীরনগর কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা মুর্শিদা বেগম বলেন, শনিবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রোববার বিকেল চারটা পর্যন্ত অন্তত আটবার লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। প্রতিবার অন্তত আধা ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ এসেছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর উপমহাব্যবস্থাপক (কারিগরি) মো. মামুনুর রশিদ মণ্ডল বলেন, গতকাল দুপুরে ৫০৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩৭০ মেগাওয়াট সরবরাহ পাওয়া গেছে। ২০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হয়েছে।
কুমিল্লা নগরসহ জেলার কয়েকটি উপজেলা সদরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পিডিবি। আর জেলার ১৮টি উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে পল্লী বিদ্যুতের চারটি সমিতির মাধ্যমে। চাহিদার বিপরীতে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে।
নাঙ্গলকোট উপজেলার ঢালুয়া গ্রামের বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ ঘণ্টার বেশি সময় লোডশেডিং থাকে। একটু গরম বাড়লে লোডশেডিং আরও বাড়ে।
কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪-এর মহাব্যবস্থাপক মো. শহীদ উদ্দিন বলেন, গড়ে ৫৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ৪০ থেকে ৪২ মেগাওয়াট। ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে আবহাওয়া ঠান্ডা থাকায় গতকাল চাহিদা কম ছিল। এর আগে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে। একই কথা বললেন কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক মো. রাশেদুজ্জামান।
সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে ময়মনসিংহ এলাকার গ্রামগুলোতে। ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এর ডিজিএম এস এম রায়হানুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ কম পাওয়ায় দিনে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
অসাধু ব্যবসার কাঠামো
আওয়ামী লীগের দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বেড়েছে পাঁচ গুণের বেশি, উৎপাদন বেড়েছে ৩ দশমিক ৬ গুণ। আর কেন্দ্রভাড়া বেড়েছে ১৬ গুণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মূলত বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে এভাবে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এ সময় দেখা গেছে, ৫ হাজার থেকে বেড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনসক্ষমতা হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট, যা চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। যদিও অর্ধেকের মতো সক্ষমতা অলস পড়ে থাকে। প্রতিবছর সরকারকে বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, যে অসাধু ব্যবসার কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, তা বহাল রেখে কোনো সংকটের সমাধান হবে না। শুধু দুর্নীতি ও লুটপাট করার লোক বদলাবে। তাই সরকারের অবস্থান বদলাতে হবে। তাহলেই এ খাতের খরচ কমে আসবে, মানুষ ন্যায্য দামে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ পাবে। একই সঙ্গে গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমবে।


















