অপরাধচিত্র রিপোর্ট: ঢাকা মহানগর পুলিশের যাত্রাবাড়ী থানার একটি পুলিশ ফাঁড়ির টয়লেট থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল কনস্টেবল শফিকুল ইসলামের মরদেহ। মৃত্যুর ঠিক আগে নিজের মেয়ের মুঠোফোনে পাঠানো শেষ বার্তায় তিনি লিখেছিলেন, “আমি তোমার জন্য কিছুই করতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করে দিও…।” পুলিশের এই সদস্য ঠিক কী করতে চেয়েছিলেন, কেন পারলেন না, কিংবা শেষ পর্যন্ত কেনই-বা আত্মহননের পথ বেছে নিলেন—সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেনি আজও। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটনাগুলোর কোনো গভীর তদন্ত হয় না; অপমৃত্যুর মামলা দিয়ে ফাইলেই বন্দি থাকে কারণগুলো।
শুধু কনস্টেবল শফিকুলই নন, বাহিনীটিতে প্রায় নিয়ম করেই ঘটছে এমন আত্মহননের ঘটনা। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত গত সাড়ে সাত বছরে অন্তত ৭৫ জন পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। মৃতদের তালিকায় সবচেয়ে বেশি রয়েছেন কনস্টেবল পদমর্যাদার সদস্যরা। এ ছাড়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার, পরিদর্শক, এসআই ও নায়েক পদমর্যাদার কর্মকর্তারাও রয়েছেন এই তালিকায়। গলায় ফাঁস লাগানো, বিষপান, নিজের অস্ত্রের গুলিতে এমনকি ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েও আত্মহননের ঘটনা ঘটেছে।
প্রাথমিক তদন্তে প্রায়ই ‘পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহ’ ও ‘মানসিক অশান্তি’কে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, কেন বা কিসের প্রেক্ষাপটে এই মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে—তা অনুসন্ধানে বাহিনীর ভেতর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গবেষণা বা প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেই।
পরিসংখ্যানে পারিবারিক কলহ, মাঠের বাস্তবতায় ভিন্ন চিত্র
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা পেছনে পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ এবং মানসিক অশান্তির কথা বলা হয়। তবে মাঠপর্যায়ে কর্মরত সদস্যরা বলছেন ভিন্ন কথা।
কনস্টেবল থেকে শুরু করে উপপরিদর্শক (এসআই) পর্যায়ের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাজের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা না থাকা এবং টানা ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালনই তাদের জীবনে প্রধান সংকট তৈরি করে। দীর্ঘ ডিউটি শেষে অস্বাস্থ্যকর ও অপরিসর ব্যারাকে ফেরা, মানসম্মত খাবারের অভাব, সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের জীবনযাত্রার খরচ চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত আর্থিক টানাপোড়েনে থাকেন তারা। সময়মতো ছুটি না পাওয়া এবং বছরের পর বছর পদোন্নতি না হওয়ার হতাশাও যোগ হয় এর সঙ্গে। পরিবারের সদস্যদের সময় দিতে না পারায় তৈরি হয় চরম দূরত্ব, যা পরবর্তীতে রূপ নেয় তীব্র পারিবারিক কলহে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার জটিলতাও এই মানসিক চাপের পেছনে অন্যতম কারণ। অনেকে জমি বিক্রি করে বা বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে চাকরি পান। পরবর্তীতে সেই ঋণের বোঝা ও প্রত্যাশার চাপ সামলাতে না পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন অনেকে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও শারীরিক ধকলের কারণে সাধারণ মানুষের গড় আয়ুর তুলনায় পুলিশ সদস্যদের গড় আয়ু অনেকটাই কমে যাচ্ছে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবার করুণ হাল
বিপুলসংখ্যক সদস্যের এই বাহিনীতে মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার আয়োজন অত্যন্ত অপ্রতুল। প্রায় পৌনে তিন লাখ সদস্যের বাংলাদেশ পুলিশে মানসিক রোগ মোকাবিলার জন্য স্থায়ী কোনো কাউন্সিলর বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে মাত্র একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দিয়ে সেবা চালানো হচ্ছে।
একটি জরিপে দেখা গেছে, দায়িত্ব পালনকালে অন্তত ৯৮ শতাংশ পুলিশ সদস্য কোনো না কোনোভাবে চরম মানসিক চাপে ভোগেন এবং ৯১ শতাংশের বেশি সদস্য পরিবারকে সময় দিতে না পেরে চরম বিষণ্নতায় থাকেন। তা সত্ত্বেও ক্যারিয়ারে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় নিজের মানসিক সংকটের কথা প্রকাশ্যে বলতে চান না কেউ। সদস্যদের আশঙ্কা, মানসিকভাবে অসুস্থ হিসেবে চিহ্নিত হলে পদোন্নতি আটকাবে এবং কাঙ্ক্ষিত পদায়ন মিলবে না।
ছয় বছর আগে ২০২০ সালে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বাহিনীর সার্বিক সংস্কার ও সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে একটি গবেষণা চালানো হয়েছিল। সেখানে কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ওভারটাইম ভাতা, স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন ও চিকিৎসাব্যবস্থার আধুনিকায়নের সুপারিশ উঠে এলেও আজও তা বাস্তবে রূপ পায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন মানসিক চাপে থাকা বা বিষণ্নতায় আক্রান্ত সশস্ত্র পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে পারে না। বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষা ও সদস্যদের জীবনের সুরক্ষায় কর্মপরিবেশ উন্নত করা, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং দ্রুত একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি।


















