অপরাধচিত্র রিপোর্ট:দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে অবনতি ঘটেছে। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে একই সঙ্গে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতাকে ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় এসব বিষয় তুলে ধরেন তিনি।
পাসের হার ৯৪.১৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪১৬ জন
প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এ বছর মোট ২ হাজার ৩৯৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৯ জন অনুপস্থিত ছিলেন। পরীক্ষায় অংশ নেন ২ হাজার ৩৭৭ জন। তাঁদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২ হাজার ২৩৮ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছেন ১৩৯ জন। পাসের হার ৯৪ দশমিক ১৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪১৬ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২ হাজার ৫১৪ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন ২ হাজার ৪৩৪ জন। পাসের হার ছিল ৯৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সে বছর অকৃতকার্য হন ৮০ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৯৮৬ জন। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে, জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ১ হাজার ৭৩৭ জন শিক্ষার্থী।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ৩ দশমিক ৪১ শতাংশীয় পয়েন্ট। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৫৭০ জন, যা প্রায় ৫৭ দশমিক ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ অর্জনকারীর সংখ্যা অর্ধেকেরও কম। ২০২৪ সালের তুলনায় এই সংখ্যা নেমে এসেছে এক-চতুর্থাংশেরও নিচে।
শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি ও পড়াশোনায় অনাগ্রহ
ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল-কলেজে আসার আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার ফলাফলে।
তাঁর মতে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের সরাসরি পাঠদান, পারস্পরিক আলোচনা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের যে গুরুত্ব রয়েছে, বাসায় বসে পড়াশোনার মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়।
শিক্ষার্থীদের আবার শ্রেণিকক্ষকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোথাও আস্থার ঘাটতি, আবার কোথাও শিক্ষার্থীদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত পরিবেশের প্রভাব রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
নিজেদের দুর্বলতা স্বীকার করে অধ্যক্ষ বলেন, ‘আমি অন্যের ওপর দায় চাপাতে চাই না। বরং নিজের দায়িত্বের জায়গা থেকে এই পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ করতে চাই। আমাদের যেসব দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে উন্নয়নের চেষ্টা করতে হবে।’
শিক্ষার্থী ধরে রাখার নীতিও ফলাফলে প্রভাব ফেলছে
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী ধরে রাখার নীতিও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম। তিনি জানান, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জিপিএ অর্জনের শর্ত থাকে। তবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিজস্ব শিক্ষার্থীদের কলেজে ভর্তির সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক নমনীয়তা রাখা হয়।
এমনকি জিপিএ ৩ দশমিক ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদেরও কলেজে ভর্তির সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। জিপিএ ৪ দশমিক ৫ না পেলে ভর্তি হতে পারবে না—এমন কোনো কঠোর শর্ত আরোপ করা হয় না।
অধ্যক্ষের ভাষ্য, নিজস্ব শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার এই নীতির কারণে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীরাও কলেজে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের কিছু শিক্ষার্থীর ফলাফল প্রত্যাশিত পর্যায়ে নিয়ে আসা কঠিন হচ্ছে। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি অংশের দুর্বলতা সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। তবে এ কারণে নিজেদের শিক্ষার্থীদের অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যেতে বাধ্য করতে চান না তাঁরা।
ফেল করা শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করার উদ্যোগ
শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হওয়ার পেছনে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন কারণ রয়েছে বলে জানান মাজেদা বেগম। তাঁর মতে, কারও নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি কম ছিল, কারও নির্দিষ্ট বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে, আবার কারও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা থাকতে পারে। কিছু শিক্ষার্থী অনিয়মিত ছিল, কেউ কেউ নির্দিষ্ট বিষয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। ফলাফল বিশ্লেষণের সময় এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘যে শিক্ষার্থী খারাপ করেছে, তার পেছনে কোনো না কোনো দুর্বলতা রয়েছে। সেই দুর্বলতাগুলো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক ঘাটতি এবং অন্যান্য সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো পূরণের চেষ্টা করতে হবে। আমরা চাই, তারা আবার নিজেদের জায়গায় ফিরে আসুক এবং ভালো ফল করুক।’
মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার পরিবর্তে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতায় গুরুত্ব
প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনার কথাও জানান অধ্যক্ষ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করিয়ে ভালো ফল করানোর পরিবর্তে বিষয়বস্তু ভালোভাবে বোঝার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। কোনো বিষয় যথাযথভাবে বুঝতে পারলে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে।
এ জন্য পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
সহশিক্ষা কার্যক্রম ও আনন্দময় পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ
প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়ে মাজেদা বেগম বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু অ্যাকাডেমিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাদের মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দময় ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে।
অধ্যক্ষ জানান, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনা, নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং তাদের মেধা ও সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটানোই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য। এ জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানের যেসব দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সব শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়নের চেষ্টা করা হবে। শিক্ষার্থীদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
সারা দেশে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ১২ লাখ ৪০ হাজার
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ৬ লাখ ৭ হাজার ৬৪৯ জন ছাত্র এবং ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জন ছাত্রী। সারা দেশে ২ হাজার ৬৯১টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা গত ২ জুলাই শুরু হয়ে শেষ হয় ৮ আগস্ট। তবে বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হয়। পরে ৯ সেপ্টেম্বর সেই পরীক্ষা শেষ হয়।


















