শেষবার বন্ধুর সঙ্গে বাসা থেকে বেরিয়ে তুরাগ নদে মিলল মরদেহ উদ্ধার নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল সিসিটিভি ও মোবাইলের তথ্য যাচাই করছে তদন্ত সংস্থা
অপরাধচিত্র রিপোর্ট: বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় এখনো কাটেনি ধোঁয়াশা। উত্তরার বাসা থেকে বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে বের হওয়ার পর কী ঘটেছিল কীভাবে তিনি তুরাগ নদের নির্জন এলাকায় পৌঁছালেন এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে তাঁর মৃত্যু হলো এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এ ঘটনায় নৌপুলিশ মূল তদন্তের দায়িত্ব পালন করছে। পাশাপাশি ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় ছায়াতদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তের অংশ হিসেবে দীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিগত তথ্য যাচাই করছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তুরাগ নদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল। প্রাথমিকভাবে এটি তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল হতে পারে বলে ধারণা করা হলেও মালিকানা নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন।
বন্ধুর সঙ্গে বের হওয়ার পর কী ঘটেছিল?
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন, দীপ এসেছেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসবেন।
বাসার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটের দিকে দীপ বাসার গ্যারেজে আসেন। কয়েক মিনিট পর তাহসিফ নিচে নামেন। সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে তাঁদের পৃথক দুটি মোটরসাইকেলে বাসা থেকে বের হতে দেখা যায়।
দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা থাকায় সেটি মেরামতের জন্য তাঁরা ওয়ার্কশপে যান। পরে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় খাবার খেয়ে হাউস বিল্ডিং এলাকায় আলাদা হয়ে যান বলে প্রথমদিকে দাবি করেন তিনি।
তবে পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে দীপের বক্তব্যে নতুন তথ্য সামনে আসে। তাঁর দাবি, তাঁরা টঙ্গীর মাজার বস্তি ও রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে পুলিশের মতো পোশাক পরা দুজনকে দেখে তাঁরা দৌড় দেন। একপর্যায়ে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন এবং তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান।
কিন্তু প্রথম বক্তব্যে রাত ১২টার দিকে আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা বললেও পরবর্তী বক্তব্যে রাত ২টার দিকে ঘটনাস্থল এলাকায় উপস্থিত থাকার তথ্য দিয়েছেন দীপ। কেন তাঁর বক্তব্যে এই পার্থক্য, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দীপের বক্তব্য নিয়ে পরিবারের আপত্তি:
তাহসিফের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের নদে ঝাঁপ দেওয়ার বিষয়ে দীপের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, তাহসিফ সাঁতার জানতেন এবং সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সুইমিং কোর্সও সম্পন্ন করেছিলেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে ছেলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে মৃত্যুর ঘটনাকে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।
তবে পরিবারের আশঙ্কা কিংবা দীপের বক্তব্য—কোনোটিকেই এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য এবং অন্যান্য আলামতের সঙ্গে তাঁর বক্তব্য মিলিয়ে দেখছেন।
তুরাগের পাশে মিলল নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল:
তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাচ্ছিল না পরিবার। পরে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তুরাগ নদ থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে একটি কালো রঙের নম্বরপ্লেটবিহীন সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পিবিআই।
সিসিটিভি ফুটেজে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাহসিফের মোটরসাইকেলের পেছনে নম্বরপ্লেট না থাকার বিষয়টি দেখা যাওয়ায় উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি তাঁর হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে পিবিআই জানিয়েছে, কাগজপত্র ও অন্যান্য তথ্য যাচাই না করে মোটরসাইকেলটির মালিকানা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, মোটরসাইকেলটি একটি চায়ের দোকানের কাছের সড়কে কয়েক দিন ধরে পড়ে ছিল। কেউ সেটি নিতে আসেনি বলেও স্থানীয়দের বক্তব্য উঠে এসেছে।
এখন তদন্তকারীদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মোটরসাইকেলটি তাহসিফের হলে সেটি সেখানে কে নিয়ে গেলেন? তিনি নিজে সেখানে রেখেছিলেন, নাকি অন্য কেউ নিয়ে গিয়েছিলেন? মোটরসাইকেলটির অবস্থান ও ঘটনাস্থলের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
রাত ১টা ৩৫ মিনিটের শেষ বার্তায় কী আছে?
তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে তাঁর মায়ের কাছে পাঠানো শেষ ভয়েস মেসেজটিও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মায়ের মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠিয়ে তাহসিফ জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন। কিন্তু এরপর আর পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়নি।
মরদেহ উদ্ধারের সময় তাঁর পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। এই ফোনের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
ফোনটির কললিস্ট, বার্তা, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য, অ্যাপ ব্যবহারের রেকর্ড এবং অন্যান্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করলে শেষ মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে কার যোগাযোগ হয়েছিল এবং তিনি কোথায় ছিলেন, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে পাঠানো বার্তার সময় তাঁর প্রকৃত অবস্থান কোথায় ছিল, বার্তাটি পাঠানোর পর ফোনটি কোথায় অবস্থান করেছে এবং এরপর কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দুর্ঘটনা, নাকি হত্যাকাণ্ড—এখনো নিশ্চিত নয়:
তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন না থাকার তথ্য উঠে এসেছে। তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাঁর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফল ছাড়া মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি দুর্ঘটনা, নাকি অন্য কোনো অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মৃত্যু—কোনো সম্ভাবনাই এখনই পুরোপুরি বাদ দেওয়া যাচ্ছে না।
তাহসিফ নদে ঝাঁপ দিয়ে থাকলে কী পরিস্থিতিতে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, পানিতে ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে কি না কিংবা মৃত্যুর আগে অন্য কোনো আঘাত বা ঘটনার শিকার হয়েছিলেন কি না, তা মেডিকোলিগ্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা না হলে পুলিশের উদ্যোগ:
শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো মামলা করার বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি। তাহসিফের বাবা জানিয়েছেন, পরিবারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন।
নৌপুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয় কি না, সে বিষয়ে অপেক্ষা করা হচ্ছে। পরিবার মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে।
এদিকে নৌপুলিশের পাশাপাশি পিবিআইও তদন্তে সহযোগিতা করছে। বিভিন্ন স্থানে সংগ্রহ করা সিসিটিভি ফুটেজ, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য এবং উদ্ধার হওয়া আলামত যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তের সামনে এখন যেসব প্রশ্ন:
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথমত, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে মরদেহ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত তাঁর প্রকৃত অবস্থান কোথায় ছিল, তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইলের তথ্যের সামঞ্জস্য খুঁজে বের করা।
এ ছাড়া কথিত ধাওয়াকারীরা কারা ছিলেন, তাঁরা আদৌ পুলিশের সদস্য ছিলেন কি না, তাহসিফের মোটরসাইকেলটি কীভাবে মাজার বস্তি এলাকায় পৌঁছাল এবং রাত ১টা ৩৫ মিনিটে পাঠানো শেষ বার্তার পর কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।
একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার এমন রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাই অনুমান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা কিংবা কারও একক বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রযুক্তিগত প্রমাণ এবং ময়নাতদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করা জরুরি।
তাহসিফের মৃত্যু কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো ঘটনা—সেই প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্ত সংস্থাগুলোর হাতে।

















