নিজস্ব প্রতিবেদক:সরকারি আবাসিক বাসা বরাদ্দ নিয়ে নিজে বসবাস না করে অন্যের কাছে ভাড়া কিংবা সাবলেট দেওয়ার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। বরাদ্দ পাওয়া বাসায় অবৈধভাবে বসবাসকারী ভাড়াটেদের আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকারি আবাসন পরিদপ্তর। নির্ধারিত সময়ের পরও কোনো বাসায় ভাড়াটে বা সাবলেট বাসিন্দা পাওয়া গেলে বরাদ্দ বাতিলসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বরাদ্দ বিধিমালা, ১৯৮২ অনুযায়ী সরকারি বাসা বরাদ্দ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিজেই ওই বাসায় অবস্থান ও বসবাস করতে হবে। বরাদ্দের শর্ত ভঙ্গ করে অন্যের কাছে বাসা ভাড়া দেওয়া বিধিমালার পরিপন্থী।
পরিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পর কোনো সরকারি বাসায় ভাড়াটে বা সাবলেট বাসিন্দা পাওয়া গেলে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই সংশ্লিষ্ট বাসার বরাদ্দ বাতিল করা হবে। পাশাপাশি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বরাদ্দপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অফিসপ্রধান ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করা হবে। বিধিমালার ১৪(৩) ধারা অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হবে।
সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন শ্রেণির মোট ১৯ হাজার ৯১টি সরকারি আবাসিক বাসা রয়েছে। এসব বাসায় বসবাসের জন্য বরাদ্দপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন থেকে নির্ধারিত বাসাভাড়া ভাতা কর্তন করা হয়। তারপরও সরকারি বাসার চাহিদা তুলনামূলক বেশি। সরকারি কলোনিতে নিরাপত্তা, খোলামেলা পরিবেশ, খেলার মাঠসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থাকায় এসব বাসার প্রতি আগ্রহ রয়েছে চাকরিজীবীদের।
তবে অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দ পাওয়া অনেক সরকারি বাসায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেরা বসবাস না করে পুরো বাসা কিংবা একাধিক কক্ষ অন্যের কাছে ভাড়া দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ সরকারি বাসার পরিবর্তে বাইরে কম খরচে বাসা নিয়ে থাকেন এবং সরকারি বাসাটি ভাড়া দিয়ে বাড়তি অর্থ উপার্জন করেন। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আয়ের উৎস থাকায় সরকারি বাসায় বসবাসের আগ্রহ কম। অন্যদিকে সীমিত বেতনে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে না পেরে কেউ কেউ বাসার একটি বা দুটি কক্ষ ভাড়া দেন বলে জানা গেছে।
ঢাকার একটি সরকারি আবাসিক কলোনিতে বসবাসকারী এক সরকারি চাকরিজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তাঁর বাসায় দুটি শয়নকক্ষের মধ্যে একটি মাসে আট হাজার টাকায় ভাড়া দিয়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও সংসারের ব্যয় সামাল দিতে ২০২২ সাল থেকে তিনি এ ব্যবস্থা চালু করেছেন বলে জানান।
এদিকে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বৃহস্পতিবার রাতে নির্দেশনা প্রকাশ করে শনিবারের মধ্যে ভাড়াটে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হলেও অনেক বরাদ্দপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, তাঁরা আগে এ বিষয়ে কোনো লিখিত নোটিশ পাননি। এত অল্প সময়ে ভাড়াটেদের বিকল্প বাসা খুঁজে দেওয়া এবং বাসা ছাড়ার ব্যবস্থা করা কঠিন বলেও মনে করছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক জহিরুল ইসলাম খান বলেন, সরকারি বাসায় অবৈধভাবে বসবাসের সুযোগ নেই। যাঁরা নিয়মবহির্ভূতভাবে বাসা ভাড়া দিয়েছেন, তাঁদের ভাড়াটে সরিয়ে নেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই মৌখিকভাবে বলা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, সরকারি বাসায় অবৈধভাবে বসবাস বন্ধে এবার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
তবে কয়েকজন সরকারি চাকরিজীবীর আশঙ্কা, স্বল্প সময়ের নোটিশকে কেন্দ্র করে হয়রানি কিংবা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাঁদের একজনের অভিযোগ, বাসা পরিদর্শন ও বরাদ্দ বাতিলের হুমকিকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নজরদারি প্রয়োজন।
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, সরকারি বাসা ভাড়া দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এ বিধির যথাযথ প্রয়োগ হওয়া প্রয়োজন। তবে তাঁর মতে, ভাড়াটেদের বাসা ছাড়ার জন্য অন্তত তিন থেকে পাঁচ দিন সময় দেওয়া যুক্তিসংগত। একই সঙ্গে এত দিন এ ধরনের অনিয়ম চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
সরকারি বাসা বরাদ্দের নিয়ম ভঙ্গ করে ভাড়া বা সাবলেট দেওয়ার প্রবণতা বন্ধে সরকারের এ উদ্যোগকে প্রয়োজনীয় মনে করছেন অনেকে। তবে নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

















