অপরাধচিত্র ডেস্ক: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সঙ্গে একটি অন্তরঙ্গ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলাম সেটিকে তার ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ বলে যে দাবি করেছেন, তা বাংলাদেশের আইনের শর্ত পূরণ করে না বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে তার সংসদীয় পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
বিয়ে আইন লঙ্ঘন, মিথ্যা বক্তব্য দেওয়া ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে এই ঘটনাটি গুরুতর আইনি সংকটের জন্ম দিতে পারে। কোনো অপকর্ম প্রমাণিত হলে তিনি তার সংসদ সদস্য পদও হারাতে পারেন।
হোটেলের ফাঁস হওয়া ভিডিও ফুটেজটিকে ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়ার পর এই আইনপ্রণেতা চরম আইনি ঝুঁকিতে পড়েছেন। এক তরুণীর সঙ্গে একটি হোটেলে কাটানো অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হওয়ার পর তিনি ফেসবুকে নীরবতা ভাঙেন এবং দাবি করেন যে তারা বিবাহিত।
তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এই বিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধ বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এটি বাধ্যতামূলক সংবিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া এড়িয়ে অবৈধ বিয়ে বা জোরপূর্বক বিয়ে নিবন্ধনের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই কেলেঙ্কারির ঘটনা এমপিকে এখন নৈতিক স্খলন, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সত্য গোপনের চেষ্টা এবং প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ বিয়েকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টার মতো একগুচ্ছ গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এ ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হলে সংসদে তার আসন শূন্য ঘোষণা করার আইনি পদক্ষেপ শুরু হতে পারে। ফলে নজরুলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
শুরুতে জামায়াত সমর্থকরা দাবি করেছিলেন, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ দিয়ে তৈরি। তবে গাজী নজরুল পরবর্তীতে ওই নারীর পরিচয় স্বীকার করেন এবং গত ১৭ জুন তাকে বিয়ে করেছেন বলে জানান।
ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওর একটিতে দেখা যায়, গাজী নজরুল দুই হাত জোর করে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন এবং দাবি করছেন ঘরটি অন্য একজন ভাড়া করেছিলেন। তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘আমি তাকে নিয়ে এই হোটেলে মাত্র একবারই এসেছি। রুমের ভাড়াও আমি দিইনি, আমার ড্রাইভার দিয়েছে। আমার ভুল হয়ে গেছে, আমাকে দয়া করে ছেড়ে দিন।’
অনলাইনে ঘুরতে থাকা অন্যান্য ভিডিওতেও ঘটনাটি ঘিরে নতুন নতুন অভিযোগ ও দাবির ঝড় উঠছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তীব্র ক্ষোভ ও নানা জল্পনা-কল্পনার পর, মঙ্গলবার নজরুল তার বক্তব্য নিয়ে ফেসবুকে হাজির হন। একটি বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, ওই নারী প্রকৃতপক্ষে তার দ্বিতীয় স্ত্রী।
পরবর্তীতে ওই আইনপ্রণেতার প্রথম স্ত্রী, ভিডিওতে দেখা যাওয়া তরুণী এবং তরুণীর বাবাও ওই তরুণীর সঙ্গে এমপি নজরুলের বিয়ে হয়েছে বলে দাবি করেন।
তবে বাংলাদেশের ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১’ অনুযায়ী, সালিসি পরিষদের পূর্বানুমতি ছাড়া বিদ্যমান স্ত্রী থাকা অবস্থায় কোনো পুরুষ পুনরায় বিয়ে করতে পারেন না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও বাংলাদেশে দ্বিতীয় বিয়ে নিষিদ্ধ নয়, তবে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমতি নিতে ব্যর্থ হলে সেই বিয়ের প্রক্রিয়া বেআইনি হয়ে যায় এবং ‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪’ অনুযায়ী তা নিবন্ধনের অযোগ্য হয়ে পড়ে।
গাজী নজরুল দাবি করেন, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামে ওই তরুণীর বাবার বাড়িতে বিয়েটি অনুষ্ঠিত হয়। তবে গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম জানান, দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির জন্য এমপি কখনো কোনো আবেদন করেননি।
এমপি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন কি না জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি বিয়ের কথা শুনেছি।’
কখন শুনেছেন–প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দেন, ‘এই তো আজকেই শুনেছি।’
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও মুখপাত্র আব্দুল আজিজের কাছে প্রশ্ন ছিল তিনি বিয়ের দাওয়াত পেয়েছিলেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনার এই প্রশ্নটা একই সঙ্গে সঙ্গত এবং একই সঙ্গে অসঙ্গত। সঙ্গত এই কারণে যে, এমপি বিয়ে করবেন, আমি জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি, আমি দাওয়াত পাব না কেন। কিন্তু অসঙ্গত এই কারণে যে, আপনি তো জানেন এই বিয়েতে বয়সের অনেকটা পার্থক্য আছে। এই বিয়েগুলো তো সেভাবে হয় না। এখানে এমপি সাহেবের প্রথম স্ত্রী আর কিছু ছোটভাই উপস্থিত ছিলেন।’
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া কথিত বিয়ের কাবিননামা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ছড়িয়ে পড়া ওই দলিলে কাজী বদরুল আলম মো. বাকী বিল্লাহর সিল রয়েছে।
কাজী বদরুল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি বিয়ে পড়াইনি, শুধু রেজিস্ট্রি করেছি।’
সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া কীভাবে রেজিস্ট্রি করলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রথম স্ত্রী নিজে উপস্থিত ছিলেন বলেই আমি এটি করেছি।’
আইনজীবীরা বলছেন, প্রথম স্ত্রীর উপস্থিতি কোনোভাবেই সালিসি পরিষদের আইনি অনুমতির বিকল্প হতে পারে না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদা খানম বলেন, স্ত্রীর শারীরিক অক্ষমতা, সন্তান ধারণে অক্ষমতা বা দাম্পত্য ক্ষেত্রে গুরুতর বিরোধের মতো নির্দিষ্ট কিছু কারণ দেখিয়ে সালিসি পরিষদে দ্বিতীয় বিয়ের আবেদন করা যায়। তবে গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী সন্তান ধারণে অক্ষম নন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া তার নির্বাচনী হলফনামায় তার সন্তানদের কথা উল্লেখ রয়েছে।
তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক কোন পর্যায়ে আছে তা নিয়ে গুঞ্জন থাকলেও, প্রথম স্ত্রী প্রকাশ্যে স্বামীর পাশেই দাঁড়িয়েছেন। এমনকি মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
আইন অনুযায়ী, সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া পুনর্বিবাহ করলে কোনো ব্যক্তি এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। পাশাপাশি, তাকে তার বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের বকেয়া দেনমোহরের সমুদয় অর্থ অবিলম্বে পরিশোধ করতে হবে।
জিম্মি করার দাবিতে ঘটনার নতুন মোড় : গাজী নজরুল অভিযোগ করেন, তাকে এবং তার দুই স্ত্রীকে ঢাকার মগবাজারে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল এবং এক লাখ টাকা আদায় করা হয়েছিল।
এক ফেসবুক পোস্টে তিনি জানান, ১৩ জুলাই তিনি তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম ও দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগমকে নিয়ে শ্বশুর মো. মাসুম বিল্লাহর অফিসে যান।
তিনি অভিযোগ করেন, সেখানে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ ৫-৭ জন অচেনা লোক নিয়ে ঘরে ঢুকে তাদের আটকে রাখেন এবং টাকা দাবি করেন। তিনি আরও দাবি করেন, তার ভাড়া করা গাড়িটি আটকে রেখে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়।
তবে এত বড় অভিযোগ করলেও গাজী নজরুল পুলিশের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেননি।
হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গাজী নজরুল আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ নিয়ে আসেননি।’
রমনা মডেল থানার ওসি মো. রাহাত খানও নিশ্চিত করেছেন, এমপি সেখানে কোনো অভিযোগ দায়ের করেননি।
এমপির এই নীরবতা নজর কেড়েছে, কারণ অতীতে গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরির একটি মামুলি বিষয় নিয়েও তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছিলেন।
পল্লবী থানার ওসি হাসান বশির জানান, ৩-৪ সপ্তাহ আগে মিরপুরের উত্তর কালশীর রোজ গার্ডেন টাওয়ারের সামনে পার্ক করে রাখা তার ভাইয়ের গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরি হওয়ার বিষয়ে গাজী নজরুল অভিযোগ করেছিলেন।
ওসি বলেন, ‘তার ভাই এসেছিলেন এবং আমি একজন অফিসার নিয়োগ করেছিলাম। পরে তিনি আর যোগাযোগ করেননি, তাই এরপর কী হয়েছে আমি বলতে পারছি না।’
জীবনবৃত্তান্ত ও কাবিননামায় নতুন প্রশ্ন : তরুণীর কিছু নথিপত্রে অসংগতি ধরা পড়ার পর পুরো ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে।
ওই তরুণীর জীবনবৃত্তান্তে গাজী নজরুল একটি সুপারিশ যুক্ত করেছিলেন, যেখানে তিনি ‘জোর সুপারিশ করছি’ লিখে ২২ জুন ২০২৬ তারিখের স্বাক্ষর দেন। অথচ একই জীবনবৃত্তান্তে তরুণীর বৈবাহিক অবস্থা লেখা রয়েছে ‘অবিবাহিত’।
তা ছাড়া, সুপারিশপত্রে এমপির দেওয়া সই এবং কাবিননামায় বর হিসেবে করা সইয়ের মধ্যে স্পষ্ট অমিল চোখে পড়ে। এসব অমিল জামায়াত এমপির রাজনৈতিক বিতর্কের পাল্লা আরও ভারী করছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যক্তিগত বিষয়ের ক্ষেত্রেও জনপ্রতিনিধিদের আইন মেনে চলতে হয়।
তিনি বলেন, ‘বিয়ে ব্যক্তিগত বিষয় হতে পারে, তবে যেখানে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা সবাইকে মেনে চলতে হবে। একজন জনপ্রতিনিধির জন্য এই দায়িত্ব আরও বেশি। সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা না হয়ে থাকলে আইনি পরিণতি ভোগ করতেই হবে। আইনি বিষয়ের বাইরেও জনপ্রতিনিধি হিসেবে বহাল থাকার ক্ষেত্রে তার নৈতিক যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।’
গাজী নজরুলের আপসের চেষ্টা : জামায়াত এমপিকে ঘিরে একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যার মধ্যে দীর্ঘতম ফুটেজটি প্রায় ছয় মিনিটের। এতে পুরো ঘটনার বিশদ চিত্র ফুটে উঠেছে।
ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন লোক জোর করে ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গাজী নজরুল ও তরুণীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। কক্ষটি একটি হোটেলের বলেই মনে হচ্ছে। কারণ, জামায়াত নেতা নিজেই ভিডিওতে বলছিলেন তার চালক এটি ভাড়া নিয়েছিলেন।
কক্ষে প্রবেশ করা ব্যক্তিরা গাজী নজরুল ও ওই তরুণীর নাম, পরিচয় ও বাড়ির ঠিকানা জানতে চান। একপর্যায়ে কিশোরী মেয়েটি বলে, গাজী নজরুল তার দাদা হন। তবে তাদের সম্পর্ক নিয়ে জামায়াত নেতা নিজে নীরব ছিলেন।
ভিডিওতে থাকা কয়েকজন অভিযোগ করেন, চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মেয়েটিকে সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে। প্রবীণ এই নেতাকে তারা হাতেনাতে ধরেছেন এবং তাদের কাছে পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করেন।
ভিডিওর শেষভাগে গাজী নজরুল নিজেকে সাতক্ষীরার জামায়াত নেতা হিসেবে পরিচয় দেন এবং বিষয়টি সামাজিক আপস-রফার মাধ্যমে সুরাহার প্রস্তাব দেন।
ভিডিওর একেবারে শেষের দিকে কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, মেয়েটির বয়স ১৩ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে।
একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘এটা নীলার বাড়ি। তারা আগে আওয়ামী লীগ করত। এখন বেশ্যাবৃত্তির জন্য বাড়ি ভাড়া দেয়।’
এরপর এক যুবক প্রশ্ন করেন, ‘আপনি এখানে আগে কতবার এসেছেন? সত্যি করে বলুন, কতবার? আমরা আপনাকে কয়েকদিন ধরে আসতে দেখছি কিন্তু ধরতে পারিনি।’
উত্তরে গাজী নজরুল বলেন, ‘আমি ওকে নিয়ে এই হোটেলে মাত্র একবারই এসেছি। রুম আমি নিইনি, আমার ড্রাইভার বুক করেছিল। আমার ভুল হয়ে গেছে। ভাই, আমাকে যেতে দিন।’


















