জাফর আলম, কক্সবাজার ব্যুরো ও আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ হুবাইব, টেকনাফ: কখনো চাকরির প্রলোভন, কখনো উন্নত জীবনের স্বপ্ন, আবার কখনো বিয়ের প্রতিশ্রুতি—কৌশল বদলালেও থামছে না কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ উপকূলের মানবপাচার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে একের পর এক ভিকটিম উদ্ধার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাচারকারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। ফলে উদ্ধার হচ্ছে মানুষ, কিন্তু অধরাই থেকে যাচ্ছে চক্রের নেপথ্যের হোতারা।
সাম্প্রতিক দুই দফা অভিযানে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের আগে ৩৭ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকের পাশাপাশি রোহিঙ্গারাও রয়েছেন। কিন্তু এসব অভিযানে পাচারচক্রের মূল সদস্যদের আটক করতে না পারায় প্রশ্ন উঠেছে—অভিযানের আগেই পাচারকারীরা কীভাবে নিরাপদে সরে যাচ্ছে?
১৫ বছর ধরে ছেলের অপেক্ষায় মা:
মানবপাচারের নির্মম পরিণতির সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর গ্রামের ৮০ বছরের সুরা খাতুন। প্রায় ১৫ বছর আগে দালালদের মাধ্যমে সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন তার ছেলে মোহাম্মদ আলী। এরপর আর ফেরেননি।
স্ত্রী ও তিন সন্তান রেখে জীবিকার আশায় বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন মোহাম্মদ আলী। কিন্তু সেই যাত্রাই তার পরিবারের জন্য হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তার শুরু। তিনি কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন কি না—আজও নিশ্চিত নয় পরিবার। কেউ কেউ ধারণা করছেন, সাগরেই হয়তো তার মৃত্যু হয়েছে।
তবুও ছেলের ফেরার আশায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন বৃদ্ধা মা।
১৭ জন উদ্ধার, পালিয়ে যায় পাচারকারীরা:
গত ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় টেকনাফ সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ লম্বরী এলাকায় অভিযান চালিয়ে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে আটকে রাখা ১৭ জনকে উদ্ধার করে এসআরবি-১৫।
বাহিনীর মিডিয়া কর্মকর্তা আ ম ফারুক জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে পাচারকারীরা পালিয়ে যায়। পরে একটি বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ১৭ জনকে উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানান, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে তাদের সেখানে জড়ো করা হয়েছিল। পরে তাদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।
আরেক অভিযানে উদ্ধার ২০:
এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৮ জনকে উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে ১৬ জন বাংলাদেশি ও দুজন রোহিঙ্গা নাগরিক।
একই দিনে বাহারছড়া উপকূলীয় এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে আরও দুই বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড।
দুই দফা অভিযানে মোট ৩৭ জন উদ্ধার হলেও কোনো পাচারকারীকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
টার্গেটে স্থানীয় যুবক, রোহিঙ্গা নারী:
অনুসন্ধানে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, পাচারকারীদের টার্গেটে রয়েছে বেকার যুবক, নিম্নআয়ের মানুষ ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। উচ্চ বেতনের চাকরি, উন্নত জীবন কিংবা অল্প খরচে বিদেশ যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে রোহিঙ্গা নারীদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর একটি প্রবণতার কথাও জানিয়েছেন উখিয়ার কয়েকজন রোহিঙ্গা মাঝি।
সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য ভিকটিমের পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ রেখে বিশ্বাস অর্জন করা হয়। এরপর ছোট ছোট দলে ভাগ করে নির্দিষ্ট স্থানে এনে জড়ো করা হয়। সুযোগ বুঝে ছোট নৌযানে করে গভীর সাগরে অপেক্ষমাণ বড় ট্রলারে তুলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
পাহাড় থেকে সাগর—বদলেছে কৌশল:
স্থানীয় সূত্রের দাবি, বাহারছড়ার হাজমপাড়া, মারিশবনিয়া, কচ্ছপিয়া ও নোয়াখালীপাড়া এলাকার দুর্গম পাহাড় ও উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবহার করে বিভিন্ন সময় লোকজনকে জড়ো করা হয়।
উখিয়ার মনখালী ও চোয়াংখালীসহ টেকনাফের বিভিন্ন দুর্গম উপকূলীয় এলাকাও পাচারের সম্ভাব্য রুট হিসেবে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় দালালরা প্রথমে ভিকটিম সংগ্রহ করে। পরে তাদের অন্য দালালদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শেষপর্যায়ে ট্রলার নিয়ন্ত্রণকারী চক্রের মাধ্যমে গভীর সাগরে পাঠানো হয়।
স্থানীয় সূত্রে অর্ধশতাধিক সদস্যের অভিযোগ:
মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আব্দুল আলী, কেফায়েত উল্লাহ, ফেরদৌস, জসীম ও মুজিবসহ বেশ কয়েকজনের নাম স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, এ ধরনের আরও বহু ব্যক্তি বিভিন্ন পর্যায়ে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত রয়েছে।
তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা আদালতের রায় বা সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কোনো কোনো ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে ফের একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
মিয়ানমারে নির্যাতনের অভিযোগ:
মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি ভয়াবহ অভিযোগ হলো—ভিকটিমদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায়।
একাধিক সূত্রের দাবি, মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রিত কিছু আস্তানা রয়েছে। সেখানে ভিকটিমদের আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য যাচাই প্রয়োজন।
যে সব প্রশ্ন রয়ে যায়:
অভিযানে ভিকটিম উদ্ধার হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানও চালাচ্ছে। কিন্তু প্রায় প্রতিবারই পাচারকারীরা পালিয়ে যাচ্ছে—এমন ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, পাচারকারীদের কাছে অভিযানের খবর আগে থেকেই পৌঁছে যাচ্ছে কি না, নাকি দুর্গম এলাকা ও স্থানীয় নেটওয়ার্কের কারণে তারা সহজেই আত্মগোপন করছে?
মানবপাচার বন্ধে শুধু ভিকটিম উদ্ধার নয়—স্থানীয় দালাল থেকে শুরু করে অর্থের লেনদেন, নৌযান নিয়ন্ত্রণকারী এবং নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ সাঈদ বলেন, মানবপাচারের বিরুদ্ধে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযানের কারণে বাহারছড়া উপকূলীয় এলাকায় মানবপাচার আগের তুলনায় কমেছে বলেও তিনি জানান।
তবে সাম্প্রতিক ৩৭ জন ভিকটিম উদ্ধারের ঘটনা বলছে, কৌশল ও রুট পরিবর্তন করে মানবপাচারের চেষ্টা এখনও অব্যাহত রয়েছে। এখন দেখার বিষয়—উদ্ধার হওয়া ভিকটিমদের জবানবন্দি ও তথ্যের ভিত্তিতে সেই অদৃশ্য নেটওয়ার্কের মূল হোতাদের কতটা আইনের আওতায় আনা যায়।

















