Saturday , 1 August 2026 |
  1. অপরাধ
  2. অপরাধচিত্র বিশেষ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. কক্সবাজার
  7. কিশোরগঞ্জ
  8. কুমিল্লা
  9. কুষ্টিয়া
  10. ক্রীড়াঙ্গন
  11. খুলনা
  12. খেলাধুলা
  13. গাইবান্ধা
  14. গাজীপুর
  15. চট্রগ্রাম

দিল ঠান্ডা মধু আইসক্রিম যেভাবে গরমে আরাম দিচ্ছে ঢাকাবাসীকে

প্রতিবেদক
Newsdesk
August 1, 2026 9:56 pm

সালেহ শফিক:

দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধির কারণে আগের তুলনায় লভ্যাংশ  কমে গেছে। এছাড়া ঝড়-বৃষ্টির দিনে প্রোডাকশন বন্ধ থাকে। প্যাডেল রিকশা চালকরা ছিল মধু আইসক্রিমের এক বড় ভোক্তা, এখন অটোরিকশা আসার কারণে রিকশাওয়ালাদের মধ্যে বিক্রি কমে গেছে। এছাড়া ঠান্ডা মৌসুমে বছরের পাঁচ-ছয় মাস উৎপাদন বন্ধ থাকে।

দক্ষিণ ঢাকার শনির আখড়া থেকে উত্তর ঢাকার কালশী পর্যন্ত সাড়ে তিনশ আইসক্রিম-ভ্যান ঘুরে বেড়ায় সকাল থেকে। ভ্যানগুলো থেকে  ভেসে আসে মাঝবয়সী এক অপেশাদার লোকের কণ্ঠ – ‘একবার খাইলে বারবার খাইতে মন চাইব, মধু আইসক্রিম, দিল ঠান্ডা গরমের আরাম। এতে আছে মধু, কিসমিস, এলাচ ও আরো কয় পদের ময়-মশলা।’

মো. শাহজাহান নামের লোকটি ছিলেন মধু আইসক্রিম ফ্যাক্টরির ম্যানেজার। তার সামনের দাঁত ছিল ফোকলা। ২০১৪ সালে বিজ্ঞাপনটি তিনি রেকর্ড করেছিলেন। তার কণ্ঠ এতই জনপ্রিয় যে আজ এক যুগ পরেও তা ভ্যানগুলোতে বাজানো হয়।

আইসক্রিমে মধু : জয়দেবপুর চৌরাস্তায় ২০০৭ সালে মধু আইসক্রিম কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আবুল কালাম ও চাঁন মিয়া। তারা আগে ঠেলা ভ্যানে করে নিজেদের তৈরি কুলফি আইসক্রিম বিক্রি করতেন। মধু আইসক্রিম ছিল তাদের অনন্য উদ্ভাবনা।

প্রথম কয়েকদিন আশপাশের লোকদের খাইয়ে যখন দেখলেন স্বাদ ঠিক আছে, তখন বিক্রি করতে বেরিয়েছিলেন। নিজেরাই বানাতেন আবার ঘুরে ঘুরে বিক্রিও করতেন। জয়দেবপুরে পানির সংকট দেখা দেওয়ায় তারা কারখানা উঠিয়ে নিয়ে যাত্রাবাড়ি চলে এলেন। ২০১২ সালের ঘটনা সেটা।

মধু, কিসমিস, এলাচ আর দারুচিনির সঙ্গে ময়দা, বিস্কুট, দুধ, গ্লুকোজ, চিনি, গুড় ব্যবহৃত করতেন তারা মধু আইসক্রিমে। তবে মশলা-ময়দার পাইকারি বাজার চকবাজারের ইমামগঞ্জ তাদের চেনা ছিল না। সেখানে বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি। ঠকে যাওয়ার সম্ভাবনা পদে পদে।

তামিম ইমামগঞ্জ চিনতেন : আবুল কালামের ভায়রার ছেলে মো. তামিম তখন কাজ করতেন নবাবপুরের তীর মার্কা জর্দা কারখানায়। নিরানব্বই সালে যখন বয়স তেরো তখন তামিম ঢাকায় আসে। কারখানার বিহারি মালিক ভালো ছিলেন, তামিমকে খুব আদর করতেন। সপ্তাহে দিতেন পঞ্চাশ টাকা। প্রথম তিন বছর হেলপার ছিলেন তামিম। তারপর বিভিন্ন মোকামে (শ্যামবাজার, চকবাজার, কাপ্তানবাজার) মাল সরবরাহের দায়িত্ব পান। এ কারণে চকবাজার ছিল তার ভালো চেনা।

খালু আবুল কালামকে তিনি ইমামগঞ্জ থেকে সপ্তাহে সপ্তাহে মালপত্র এনে দিতেন। দোকানদাররা ছিল তার চেনা। তার ওপর মশলাও চিনতেন, তাই ঠকতেন না। তখন পোস্তগোলা, শ্যামপুর, চিটাগাং রোড, ডেমরা, ফতুল্লায় এমনকি নারায়ণগঞ্জে মধু আইসক্রিমের সমকক্ষ কেউ ছিল না।

কারখানা আনলেন মিরপুরে : চাঁন মিয়া এর মধ্যে পারিবারিক ঝামেলায় পড়ে  পার্টনারশিপ বিক্রি করে দিয়ে গ্রামে চলে যান। আবুল কালাম তখন তামিম ও তার নিজের ছেলেদের অংশীদার হতে বলেন। তামিমের পরিবারে ততদিনে প্রয়োজন বেড়েছে, ছোট বোনের বিয়ে দেওয়া দরকার, আরো ইনকাম ছাড়া উপায় নেই। নিজের কিছু সঞ্চয় ছিল, জর্দার মালিকের কাছ থেকেও কিছু সহযোগিতা পেয়েছিলেন। তাই সাহস করে ফেললেন।

নিজের নামে লাইসেন্স (তামিম মধু আইসক্রিম) নিয়ে মিরপুর বেড়িবাঁধে কারখানা গড়লেন। আবুল কালামের ছেলে অর্থাৎ তামিমের খালাতো ভাই রীপনও লাইসেন্স নিলেন, বুঝে নিলেন যাত্রাবাড়ি কারখানার দায়িত্ব। আরো দুই ভাই চিটাগাং রোড ও জালকুড়িতে আরো দুটি কারখানা করলেন। এটা ২০১৬ সাল।

তামিম সঙ্গে নিলেন একজন সিনিয়র কারিগর, মেশিনম্যান নিলেন নিজের ভাগ্নেকে  আর একজন হেলপার থাকল। কারিগর মাল তৈরি করে, হেলপার উপকরণ এগিয়ে দেয় আর মেশিনম্যান প্যাকিংয়ের দায়িত্বে থাকে।

আইসক্রিম বানাতে প্রথমে গুড়কে শিরায় পরিণত করতে হয় তারপর ময়দা মিক্স করতে হয়। সে মিক্সার আধঘণ্টা জ্বাল দিয়ে শিরা লাল হলে বিস্কুট, চিনি ও অন্যান্য মশলা মিলিয়ে ফর্মায় (ছাঁচ) ঢেলে দেওয়া হয়। তারপর ঠান্ডা পানির হাউজে ফর্মা ভাসিয়ে রেখে কাঠি গুজে নির্দিষ্ট সময় রেখে দিলে আইসক্রিম জমাট বেঁধে যায়। একেকটি ফর্মায় ৪৫টি করে আইসক্রিম তৈরি করা যায়।

মধু আইসক্রিমের বিজ্ঞাপন : বেড়িবাঁধের কারখানা ভাড়া ছিল ৩১ হাজার টাকা, সিনিয়র কারিগরের বেতন ছিল ২৫ হাজার টাকা আর মেশিনম্যানের ১০ হাজার টাকা। তিন কোয়ালিটির আইসক্রিম ছিল- সাদা, লাল ও ছানা মালাই। দাম ছিল ৫ টাকা, ১০ টাকা ও ১৫ টাকা। তামিম জানালেন, সবগুলোতেই সব উপকরণ থাকে তবে পরিমাণে কম-বেশি।

দুই বছর পর ২০১৮ সালে তামিমের আইসক্রিম ভ্যান হলো ২৬টি। কারিগর  ৬ জন।  তামিমের ভ্যান ঘুরে বেড়ায় ঢাকা উদ্যান, সওয়ারিঘাট, মগবাজার, নিউ মার্কেট, কালশী বা ক্যান্টনমেন্ট। সব মিলিয়ে চলছিল ভালোই।

তবে বেড়িবাঁধ শ্মশানঘাট এলাকায় মন্দ লোকদের আনাগোনা ছিল, বিশেষ করে মাদকসেবীদের। তামিম তাই ২০২০ সালে দারুসসালাম থানার কাছে টালি কোম্পানি এলাকায় কারখানা নিয়ে আসেন। কিন্তু বাইশ দিনের মাথায় করোনা হানা দেয়। তামিমকে কারখানা বন্ধ করে কারিগরসহ বসে থাকতে হয়। আইসক্রিম কোম্পানির নিয়ম হলো কারিগরদের বেতনবাদেও থাকা, খাওয়া, পোশাক, ওষুধ সব কোম্পানিকে বহন করতে হয়।

নতুন প্রোডাক্ট চকবার : দুই দফা করোনার হানায় প্রায় পনের মাস বসে থাকতে হয়েছিল তামিমকে। লোকসান গুনতে হয়েছিল ১০ লক্ষাধিক টাকা। করোনা বিদায় হলে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে এবং একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আবার ২০২৩ সালে নতুন একটি ভবনে আরো বড় করে কারখানা চালু করেন তামিম। হেলপার, মেশিনম্যান, কারিগর মিলিয়ে ১০ জন কর্মী। চকবার নামে নতুন আরেকটি প্রোডাক্ট আনেন। প্রতিদিন উৎপাদন করেন ২০ থেকে ২৫ হাজার পিস।

বেতন, ভাড়া বাদে উপকরণ খরচও অনেক। এক হাজার পিস আইসক্রিমে মধু লাগে আধা কেজি যার দাম ৪০০ টাকা। চিনি লাগে ৫ কেজি, ময়দা ৪ কেজি। তামিম পনেরো দিনের বাজার একসঙ্গে মৌলভীবাজার থেকে করে আনেন। এর মধ্যে আছে ৩০ বস্তা ময়দা (১ বস্তা সমান ৫০ কেজি), চিনি ২০ বস্তা, কিসমিস ১০ কেজি সাড়ে ৮ হাজার টাকা। গুড় কেনেন ছয় মাসের হিসাব করে দেড় লাখ টাকায় ৮ টন। মধু বিশ দিনের জন্য ১০ গ্যালন।

প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অবিক্রিত বা গলে যাওয়া প্রোডাক্ট কারখানায় ফেরত আসে। তামিম আরো জানালেন, দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধির কারণে আগের তুলনায় লভ্যাংশ  কমে গেছে। এছাড়া ঝড়-বৃষ্টির দিনে প্রোডাকশন বন্ধ থাকে। প্যাডেল রিকশা চালকরা ছিল মধু আইসক্রিমের এক বড় ভোক্তা, এখন অটো রিকশা আসার কারণে রিকশাওয়ালাদের মধ্যে বিক্রি কমে গেছে।  ঠান্ডা মৌসুমে বছরের পাঁচ-ছয় মাস উৎপাদন বন্ধ থাকে।

এক লাখ পিস ডেইলি : তামিম বললেন, “কাঠি আইসক্রিমে আমরা বলা যায় এক নম্বর। আমাদের যাত্রাবাড়ি কারখানাটি সবচেয়ে বড়। সেখানে ৩০০টি ভ্যান আছে। পাঁচ টাকার মাল তুলে দিব ভাবছি, এত কম টাকায় কোয়ালিটি রক্ষা করা যায় না। আমাদের আইসক্রিম খেয়ে কেউ অসুস্থ হয়েছে এমন অভিযোগ পাবেন না।”

বড় বড় আইসক্রিম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ভিড়ে আপনাদের টিকে থাকার কারণ কি? উত্তরে তামিম বললেন, “আমরা সাধারণ গরীব মানুষের দিল ঠান্ডা করি। গত বিশ বছরে আমাদের ওপর অনেক লোকের আস্থা তৈরি হয়েছে। আমরা কম মূল্যে ভালো আইসক্রিম দিয়ে থাকি। প্রতিদিন কমবেশি এক লাখ মধু আইসক্রিম বিক্রি হয়।”

কারখানায় আপনার কাজ কি? জানতে চাইলে তামিম উত্তর দিলেন, “আমি মূলত হিসাব রাখি। সকাল সাতটা থেকে নয়টার মধ্যে ভ্যানগুলো বেরিয়ে যায়। তখন খাতায় লিখে রাখি কে কতগুলো আইসক্রিম নিয়ে বের হলো। আবার দুপুর তিনটা থেকে ভ্যানগুলো ফিরতে শুরু করে। তখন কে কতগুলো বিক্রি করেছে তার হিসাব নিয়ে টাকা বুঝে নিই। এছাড়া কারখানায় কোনো সমস্যা হলে তা সমাধান করি, কোয়ালিটি চেক করি এবং কারিগরদের কাজ তদারকি করি।”

কারখানায় কাজ শুরু হয়  সকাল আটটায়, চলে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত। একদিনের সব আইসক্রিম ফ্রিজে রেখে দেওয়া হয়। পরেরদিন সেগুলো নিয়ে বের হন ভ্যানওয়ালারা।

আবুল কালামের মেয়ে মানে তার খালাতো বোনকে বিয়ে করেছেন তামিম। দুটি মেয়ে আছে তাদের। দুজনেই পড়াশোনায় ভালো। তামিমের ইচ্ছে মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন।

সর্বশেষ - রাজনীতি