নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশে প্রতিবছর প্রায় ২৬ লাখ টন আম উৎপাদন হয়। কিন্তু সেই বিপুল উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানি এখনও নগণ্য। বিশ্বের নানা দেশে বাংলাদেশের আমের স্বাদ ও চাহিদা থাকলেও কঠোর কোয়ারেন্টিন শর্ত, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকিং ও পোকামাকড়মুক্তকরণ সুবিধার অভাবে বহু সম্ভাবনাময় বাজারে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি। এবার সেই দীর্ঘদিনের বাধা দূর করার পথে বড় পদক্ষেপ নিল সরকার। রাজধানীর গাবতলীতে দেশের প্রথম ‘ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট’ (ভিএইচটি) প্ল্যান্ট উদ্বোধন করা হয়েছে। আজ সোমবার প্ল্যান্টটির উদ্বোধন করেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ফলকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মধ্যে উত্তপ্ত করা হয়। এতে ফলের গুণগত মান অক্ষুণ্ন থাকে, কিন্তু পোকামাকড় ও রোগজীবাণু ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে আম আন্তর্জাতিক কোয়ারেন্টিন মান পূরণ করে এবং কঠোর আমদানি নীতির দেশগুলোতে রপ্তানির উপযোগী হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বাস্তবায়িত এই প্ল্যান্টটি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১২ টন আম প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম। প্রতি কেজি আম প্রক্রিয়াজাত করতে ব্যয় হবে মাত্র ৩ টাকা। প্ল্যান্টটিতে স্বয়ংক্রিয় কনভেয়ারভিত্তিক প্যাকেজিং লাইনও স্থাপন করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানের প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ বলেন, কৃষিপণ্য রপ্তানির সব ধরনের প্রক্রিয়া এক জায়গা থেকে সম্পন্ন করার জন্য গাবতলীর ভিএইচটি সেন্টারে কোয়ারেন্টাইন অফিস চালু করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা রপ্তানির ক্ষেত্রে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করছি। এখানে পণ্য আসবে, ধোয়া হবে, প্যাকিং হবে এবং এখানেই কোয়ারেন্টাইন সম্পন্ন করে সরাসরি বিমানবন্দরে পাঠানো যাবে।’
কৃষিমন্ত্রী জানান, বিমানবন্দরে রপ্তানিকৃত ফল সংরক্ষণের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্বল্পমেয়াদি সংরক্ষণাগার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে আমসহ দ্রুত নষ্ট হওয়া কৃষিপণ্যের গুণগত মান বজায় থাকবে। রপ্তানি খরচ কমাতে বাংলাদেশ বিমানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের সঙ্গে কার্গো সুবিধা বৃদ্ধি এবং আগাম কার্গো স্পেস সংরক্ষণের বিষয়েও আলোচনা করা হবে।
কৃষিমন্ত্রী জানান, শুধু আম নয়, লিচু, কাঁঠাল, বরই, টমেটো, পেঁপে ও মিষ্টি আলুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যও এই কেন্দ্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য সারাদেশে কয়েক হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত বেসরকারি সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা ‘গ্লোবাল জি.এ.পি.’-এর প্রশিক্ষক এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, ভিএইচটি প্রযুক্তির প্রবর্তন বাংলাদেশের আম রপ্তানি শিল্পের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের ফল আমদানির জন্য আলাদা আলাদা কোয়ারেন্টিন শর্ত রয়েছে। ভিএইচটির মাধ্যমে আম কোয়ারেন্টিনভুক্ত পোকামাকড়মুক্ত হয় এবং কঠোর আমদানি মানসম্পন্ন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়।
মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে আম, সবজি, ফল ও শুকনো খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আরাত অ্যাগ্রো বিডির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ কাঞ্চন মিয়া বলেন, অনুমোদিত ট্রিটমেন্ট সুবিধা না থাকায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে কিছু প্রিমিয়াম বাজারে প্রবেশের সুযোগ হারিয়েছে। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের আমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, কিন্তু ভিএইচটি সুবিধা না থাকায় আমরা সেখানে প্রবেশ করতে পারিনি। সম্প্রতি পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত ট্রিটমেন্ট নিয়ে উদ্বেগের কারণে জাপান ভারত থেকে আম আমদানি স্থগিত করেছে। যেহেতু জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ভিএইচটি বাধ্যতামূলক, তাই বাংলাদেশের জন্য এখন এসব বাজারে প্রবেশের বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে।


















