বরিশাল প্রতিনিধি: ভোলা: সরকারি জমি রক্ষার দায়িত্ব যার ওপর, তিনিই বনে গেছেন ‘ভক্ষক’। ভোলায় ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) মো. মুশফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়া, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে অর্পিত সম্পদ (ভিপি জমি) নামজারি করা এবং অবৈধভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়।
পাঁচ বছরের ছেলেকে ‘বিবাহিত’ দেখিয়ে জমি হাতিয়ে নেওয়া
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৪ সালে মুশফিকুর রহমান চরফ্যাসন উপজেলার চর মানিকা ইউনিয়নের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা পদে কর্মরত ছিলেন। সে সময় নিয়মকানুন উপেক্ষা করে জালিয়াতির মাধ্যমে চর কচ্ছপিয়া ও দক্ষিণ আইচা মৌজায় নিজের এবং নিকটাত্মীয়দের নামে দেড় একর করে মোট ২০টি খাসজমির বন্দোবস্ত নেন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, ২০০৪ সালে মুশফিকের ছেলে মাহফুজুর রহমান রিমনের বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। অথচ নথিপত্রে তাকে ২৫ বছরের যুবক, বিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক দেখিয়ে খাসজমির বন্দোবস্ত নেওয়া হয়। চর কচ্ছপিয়া মৌজার দিয়ারা ৩৯৪ ও ৩৯৫ নম্বর খতিয়ানের মোট তিন একর জমি রিমনের নামে নেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, রিমনের স্ত্রীর নাম হিসেবে ‘হাফসা বেগম’ ও ‘ফাতেমা বেগম’ নামের দুই কাল্পনিক নারীর নাম ব্যবহার করা হয়।
স্বচ্ছল শিক্ষক বাবাকে ‘নদীভাঙা ভূমিহীন’ সাজানো
মুশফিকের বাবা মফিজুর রহমান ছিলেন দৌলতখান উপজেলার জয়নগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। এলাকায় তার একাধিক বাড়িসহ নিজস্ব সম্পত্তি ছিল। অথচ সেই শিক্ষক বাবাকে নদীভাঙা ও ভূমিহীন দেখিয়ে চর কচ্ছপিয়া ও দক্ষিণ চর আইচা মৌজায় তিন একর খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়া হয়। এছাড়া মুশফিক নিজের ডাকনাম ‘মোশারেফ’ ব্যবহার করে এবং ভগ্নিপতি আবুল কাশেমের নামে জালিয়াতি করে সরকারি জমি হাতিয়ে নেন। সব মিলিয়ে তার পরিবারের নামে অন্যায়ভাবে ৯ একর খাসজমি লিখে নেওয়া হয়, যা খাসজমি বণ্টন নীতিমালার চরম লঙ্ঘন।
স্ট্যাম্পে খাসজমি বিক্রি ও নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার
সরকারি খাসজমি হস্তান্তর বা বিক্রি করা আইনত নিষিদ্ধ হলেও মুশফিক স্ট্যাম্পের মাধ্যমে এসব জমি অন্যদের কাছে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। লালমোহন উপজেলার প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও স্থানীয় জিয়া আকনসহ কয়েকজনের কাছে তিনি সাড়ে পাঁচ একরেরও বেশি জমি বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন।
ভূমিহীন কৃষক মো. সিরাজ অভিযোগ করেন, ২০১৮ সালে রাজনৈতিক প্রভাব ও নিজস্ব ‘গুণ্ডা বাহিনী’ ব্যবহার করে তাকে পৈতৃক জমি থেকে উচ্ছেদ করেন মুশফিক। সেখানে তৈরি করা হয় দুটি আধা-পাকা ঘর। শুধু সিরাজই নন, বহু নিরীহ মানুষকে হয়রানি ও নির্যাতন করেছেন এই ভূমি কর্মকর্তা।
এমনকি চার দশক আগে ‘বাংলাদেশ চার্চ সমাজ উন্নয়ন কার্যক্রম’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার গড়ে তোলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের জমিও নিজের দাবি করে সেখানকার ৫৪টি অসহায় পরিবারকে উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছেন মুশফিকের অনুসারীরা। চার্চের কচ্ছপিয়া আশ্রয় কেন্দ্রের পরিচালক মো. সায়েদ ফরাজি জানান, চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এখানকার দরিদ্র বাসিন্দারা।
মৃত ব্যক্তিদের নামে ভিপি জমির নামজারি
২০২৪ সালে চরফ্যাসনের নুরাবাদ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালে সরকারি ভিপি (অর্পিত) জমির দিকে নজর পড়ে মুশফিকের। মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ২৭ একর ভিপি জমির নামজারি করান তিনি। এর মধ্যে চর নিলকমল মৌজার একটি খতিয়ানের ১১ একর ১০ শতাংশ জমি আটজন ব্যক্তির নামে নামজারি করা হয়, যাদের মধ্যে চারজনই ছিলেন মৃত!
ঘুষের বিনিময়ে এই জালিয়াতিতে সহযোগিতা করেন তৎকালীন সার্ভেয়ার কবির হোসেন এবং তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ সালেক মুহিদ নামজারিটি অনুমোদন দেন। পরবর্তীতে জালিয়াতির বিষয়টি জানাজানি হলে বর্তমান সহকারী কমিশনার নামজারিগুলো বাতিল করেন।
অভিযোগ অস্বীকার ও প্রশাসনের আশ্বাস
এসব অনিয়ম ও জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মুশফিকুর রহমান সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। নথিপত্র দেখালে তিনি বন্দোবস্ত গ্রহীতা স্বজনদের চেনেন না বলে দাবি করেন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে ‘পূর্বশত্রুতা’কে দায়ী করেন।
চরফ্যাসন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এমাদুল হোসেন জানান, বেআইনি বন্দোবস্তের প্রমান পাওয়া গেলে তা বাতিলের আইনি সুযোগ রয়েছে।
ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান জানান, অভিযোগের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। একজন সরকারি কর্মকর্তা নিজে বা পরিবারের নামে অন্যায়ভাবে খাসজমি নিয়ে থাকলে তা চরম অপরাধ। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

















