নেত্রকোনা থেকে জাহিদ হাসান: রক্ষকই যখন ভক্ষক’— এই প্রবাদের বাস্তব রূপ দেখা গেছে নেত্রকোনা জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সামাজিক বনায়ন প্রশিক্ষণ ও নার্সারি কেন্দ্র (এসএফএনটিসি) ও বন বিভাগের কার্যালয়ে। প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ফরেস্ট রেঞ্জার রামকৃষ্ণ ঘোষের বিরুদ্ধে কার্যালয় চত্বরের বহু পুরোনো ও মূল্যবান গাছ কেটে রাতের আঁধারে সরানোর সময় যোগসাজশের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কার্যালয় চত্বর থেকে দিনভর রেন্ট্রি, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পুরোনো গাছ কেটে ছয়টি হ্যান্ডট্রলি ও ভ্যানে করে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। স্থানীয়দের মতে, এসব গাছের আনুমানিক বাজারমূল্য কয়েক লাখ টাকা।
জনতার হাতে গাড়ি আটক ও ঘুষের প্রস্তাব:
ঘটনার দিন রাতে কাঠবোঝাই গাড়িগুলো বের হওয়ার সময় বিষয়টিকে ঘিরে স্থানীয় জনতা ও সাংবাদিকদের সন্দেহ হয়। গাছ কাটার বৈধ অনুমতিপত্র দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। একপর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসেন বন বিভাগের স্পিডবোট চালক পিয়ন ইন্দ্রজিৎ অভিযোগ উঠেছে সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করতে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে দুই হাজার টাকা ঘুষের প্রস্তাবও দেওয়া হয়। তবে সাংবাদিকরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সত্য উদঘাটনে সচেষ্ট থাকেন।
কথোপকথনের সিসিটিভি ও অডিওতে জালিয়াতির প্রমাণ ঘটনার সময়ে ধারণকৃত ভিডিও ও অডিওর প্রতিলিপিতে দেখা যায়, সাংবাদিকরা যখন ফরেস্ট রেঞ্জার রামকৃষ্ণ ঘোষের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন, তখন তিনি প্রথমে বিষয়টিকে ‘কিছু সাধারণ ডালপালা কাটা’ বলে দাবি করে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু গাড়িতে ডালপালার জায়গায় বিশাল আকৃতির কাঠের গুঁড়ি দেখতে পেয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন তুললে একপর্যায়ে তিনি গাছ কাটার কথা স্বীকার করেন। অডিও রেকর্ডে উপস্থিত এক সাংবাদিককে ফোনে বলতে শোনা যায় আপনার স্টাফ ইন্দ্রজিৎ নিজেই স্বীকার করেছে আপনার পারমিশনে এসব কাঠ বাইরে নেওয়া হচ্ছে। উপরন্তু আমাদের ২০০০ টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করেছে।” ফরেস্ট রেঞ্জারের আশকারা ও প্রত্যক্ষ সহায়তায় পাঁচটি গাছবোঝাই গাড়ি কার্যালয় থেকে বের হয়ে যেতে সক্ষম হলেও একটি গাড়ি স্থানীয় জনতা আটক করে রাখে।

চালক আটক ও নেত্রকোনা পুলিশের অভিযান:
খবর পেয়ে নেত্রকোনা মডেল থানার এসআই মুনসুরের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে একটি কাঠবোঝাই ট্রলি এবং চালক রুবেল মিয়াকে (৩০) আটক করে থানায় নিয়ে যায়। আটক রুবেল মিয়া বারহাট্টা উপজেলার পটুয়াকান্দা (দেউলি) গ্রামের দুলাল মিয়ার ছেলে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাঠ পাচারে জড়িত বন বিভাগের কর্মচারী ইন্দ্রজিৎ, আটককৃত ড্রাইভার রুবেল এবং কাঠ ব্যবসায়ী ফারুক একই এলাকার বাসিন্দা। এতে করে কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ ঘোষ ও কর্মচারী ইন্দ্রজিতের সমন্বয়ে একটি সংঘবদ্ধ কাঠ পাচার চক্র সক্রিয় থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আটককৃত চালকের চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি:
ঘটনাস্থলে জিজ্ঞাসাবাদে ভ্যানচালক স্পষ্ট জানান, ইন্দ্রজিতের নির্দেশে ১১-১২ শত টাকায় তিনি এই কাঠ ঠাকুরকোনার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কাঠগুলো কোথা থেকে কাটা হয়েছে এবং সরকারি কি না তা চালক জানতেন না বলে জানান।
জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ:
বিষয়টি নিয়ে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান এঁর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস দেন। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক জানান, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং জব্দকৃত গাছগুলো বর্তমানে সরকারি হেফাজতে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
জনমনেক্ষোভ ও প্রশ্ন:
সরকারি একটি জেলা দপ্তরের কার্যালয়ের ভেতর থেকে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা মেহগনি ও রেন্ট্রি গাছ কার নির্দেশে এবং কার স্বার্থে কাটা হলো— তা নিয়ে চরম জনক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেছেন, শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বন কর্মকর্তার দপ্তরের ভেতরের গাছই যদি ফরেস্ট রেঞ্জারের নজরদারিতে নিরাপদ না থাকে, তবে সীমান্তবর্তী বনাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার পরিবেশ ও বনসম্পদের নিরাপত্তা কোথায়?
এবিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ও পরিবেশবাদীরা এসএফএনটিসি ফরেস্ট রেঞ্জার রামকৃষ্ণ ঘোষসহ সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও বিভাগবহির্ভূত নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

















