আবদুল্লাহ আল মামুন, সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি:
টানা তিন মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের দুয়ার খুললেও উপকূলীয় বনজীবীদের মুখে স্বস্তির হাসি নেই। বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সব ধরনের প্রবেশাধিকার বন্ধ থাকার পর মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে জেলে ও পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন উন্মুক্ত করা হয়। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জীবিকার তাগিদে বনে ফেরার এই আনন্দে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেপরোয়া জলদস্যু বাহিনী। সুন্দরবনে প্রবেশের পূর্বশর্ত হিসেবে জেলেদের দিতে হচ্ছে বিপুল অংকের চাঁদা, যা নিয়ে পুরো উপকূলজুড়ে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
সাতক্ষীরা রেঞ্জ সংলগ্ন গাবুরা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বনজীবীরা তাদের নৌকা ও জাল প্রস্তুত করলেও সবার চোখে-মুখে জলদস্যুদের তাণ্ডবের আতঙ্ক। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সাতক্ষীরা অঞ্চলকেন্দ্রিক অন্তত তিনটি জলদস্যু বাহিনী এলাকা ভাগ করে বনের গহীনে রাজত্ব চালাচ্ছে। এরা হলো—‘বড় জাহাঙ্গীর-দয়াল-নানা ভাই ওরফে ডন আনারুল’, ‘মঞ্জু বাহিনী’ এবং ‘দুলাভাই বাহিনী’। সশস্ত্র এই তিন দলে প্রায় ১২০ থেকে ১৪০ জন সদস্য সক্রিয় রয়েছে।
দস্যুদের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, সুন্দরবনে ঢোকার আগেই প্রতিটি নৌকাকে আলাদাভাবে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে তিন বাহিনীর দাবি মিটিয়ে বন বিভাগে যাওয়ার আগেই একটি নৌকাকে মোট ৭৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত গুণতে হচ্ছে। আর এই চাঁদা না দিয়ে বনে নামার দুঃসাহস দেখালে জেলেদের অপহরণ করে আদায় করা হচ্ছে দ্বিগুণ মুক্তিপণ।
সাতক্ষীরা রেঞ্জে রেজিস্টার্ড বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯০০টি। প্রতি নৌকায় দুই থেকে তিনজন করে প্রায় ৯ হাজার জেলে ধাপে ধাপে বনের নদী-নালায় প্রবেশ করেন। মহাজন ও এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই বিপুল পরিমাণ চাঁদা মেটাতে গিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে সাধারণ বনজীবীদের। চরম হুমকির মুখে থাকলেও প্রাণভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না কেউ। স্থানীয়দের অভিযোগ, দস্যুদের এই প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির বিষয়ে প্রশাসনের ভূমিকা কার্যত নীরব, যা সাধারণ জেলেদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
অবশ্য বনজীবীদের নিরাপত্তা ও জলদস্যু দমনে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং জেলেদের সুরক্ষায় কোস্টগার্ড, বন বিভাগের ‘স্মার্ট পেট্রোলিং’ টিম ও বনকর্মীরা সুন্দরবনের গহীনে নিয়মিত টহল জোরদার রাখছে বলে জানানো হয়েছে।
সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মশিউর রহমান জানান, সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া মেনে অনুমতিপত্র (পাস) নিয়ে জেলেদের বনে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বনের ভেতরে যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বিষ দিয়ে মাছ ধরা কিংবা হরিণ শিকারের মতো অপরাধ দমনে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


















