অপরাধচিত্র ডেস্ক : গত বছরের ২৫ মে সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ফারুককে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের প্রশাসক নিয়োগ করে সরকার। এই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়। রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট তার নিয়োগ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে ইউজিসির করা লিভ টু আপিলের এক শুনানিতে আপিল বিভাগ প্রশাসক নিয়োগকে বৈধ বলে রায় দেন। একই সঙ্গে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের তিন সদস্যকে অযোগ্য ও অন্য সদস্যদের নিষ্ক্রিয় ঘোষণা করেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলে পর্যবেক্ষণও দেন আপিল বিভাগ।
অভিযোগ উঠেছে, আদালতের এ নির্দেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজেদের ‘বানানো’ উপাচার্য (ভিসি) দিয়ে প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চালাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। প্রশাসক নিয়োগ পেলেও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ফারুককে একটুও সহযোগিতা করেনি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসন। এক বছরে তিনি মাত্র দুই দিন অফিস করেছেন। বর্তমানেও সব ধরনের আর্থিক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রশাসককে উপেক্ষা করা হচ্ছে। কোনো নোটিশের অনুলিপিও তাকে দেওয়া হচ্ছে না।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, সনদ জালিয়াতি, তহবিল আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ইউজিসির তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে এবং এ বিষয়ে দুদকে মামলাও হয়েছে। তা সত্ত্বেও উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ ও সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর না করে একই ট্রাস্টি বোর্ড প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে যাচ্ছে।
অবৈধ উপায়ে অপসারণ, অবৈধ উপায়ে নিয়োগ!
অভিযোগ আছে, ২০২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য প্রফেসর প্রকৌশলী মোজাম্মেল হককে বেআইনিভাবে অপসারণ করে বোর্ড অব ট্রাস্টি। পরে রাষ্ট্রপতির কোনো আদেশ ছাড়াই ট্রেজারার শরীফ আশরাফুজ্জামানকে ভিসির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন সেক্টরে ট্রেজারার শরীফ আশরাফুজ্জামানকে ভিসি হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী বৈধ নয়।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৩১ এর (৬) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন, তাহলে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ভিসির দায়িত্ব পালন করবেন। প্রো-ভিসির পদও শূন্য থাকলে ট্রেজারার দায়িত্ব পালন করবেন। ৩১ এর (৯) ধারায় বলা হয়েছে, চ্যান্সেলর সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কোনো কারণে, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সুপারিশক্রমে, ভাইস-চ্যান্সেলরকে অপসারণ করতে পারবেন—যা সাবেক ভিসি মোজাম্মেল হকের ক্ষেত্রে করা হয়নি। তাকে অবৈধভাবে অপসারণ করা হয়।
এদিকে যাকে এখন ওয়েবসাইটে ভিসি হিসেবে দেখানো হচ্ছে, সেই শরীফ আশরাফুজ্জামানের এমবিএ সার্টিফিকেট ভুয়া বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র বলছে, তিনি এমবিএ সনদ দেখিয়েছেন সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৯৮ সালের; অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০৩ সালে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হতে হলে শিক্ষকতায় ১০ বছরসহ আরও ১০ বছর প্রশাসনিক ও গবেষণা এবং প্রবন্ধ লেখার অভিজ্ঞতাসহ মোট ২০ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়, যা শরীফ আশরাফুজ্জামানের নেই।
সরকারের বিরুদ্ধে আটটি রিট
জানা যায়, ২০২৩ সালে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান একটি রিট পিটিশন দায়ের করলে শিক্ষকদের বেতন ও ইনক্রিমেন্টের ব্যাংকিং লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। একই বছর ট্রাস্টি সদস্য সরোয়ার জাহানের করা আরেকটি রিটে তৎকালীন ভিসি প্রফেসর মোজাম্মেল হকের কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণা করেন আদালত। তবে ওই সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভিসি মোজাম্মেল হককে বৈধ বলে সিদ্ধান্ত দিলে রিটকারী সরোয়ার জাহান আর রিটটি চালিয়ে নেননি।
২০২৪ সালে একই ভিসির বিরুদ্ধে আরেকটি রিট দায়ের করা হয় এবং মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে ব্যর্থ হয়ে আপিল বিভাগে ‘লিভ টু আপিল’ করা হয়। সর্বশেষ বর্তমান প্রশাসকের বিরুদ্ধেও একটি রিট ও একটি লিভ টু আপিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সরকার ও ইউজিসির বিরুদ্ধে এই পর্যন্ত আটটি রিট দায়ের করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই করেছেন বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য সরোয়ার জাহান।
অনিয়ম রোখার চেষ্টার জেরে পদে কোপ
জানতে চাইলে সাবেক ভিসি প্রফেসর মোজাম্মেল হক জানান, তিনি ২০২১ সালের ১ এপ্রিল ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তখন প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিলে বোর্ড অব ট্রাস্টি তার পেছনে লাগে। তাকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সহযোগী ট্যাগ দিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়।
তিনি জানান, তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ট্রাস্টি বোর্ড সদস্য সরোয়ার জাহান, তার স্ত্রী ইসরাত জাহানসহ অন্যান্যের বিরুদ্ধে একটি কোচিং সেন্টার ও ব্যক্তির নামে এজেন্ট ব্যাংকিং শাখা খুলে আর্থিক দুর্নীতি, ৫০০টি সনদের মধ্যে ১০৫টি সনদ জাল শনাক্ত, ঋণের নামে ফান্ড থেকে নিজ নামে ৭৫ লাখ টাকার চেক সই করানোর চেষ্টা এবং প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে প্রায় সাত কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ তদন্ত করে ইউজিসির ৫ সদস্যের কমিটি। তদন্তে আর্থিক দুর্নীতি ও সনদ জালিয়াতির প্রমাণ মেলে। পরে দুদকে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ এর অধিকাংশ ধারা লঙ্ঘন করেছেন। ইসরাত জাহান জাল সনদ প্রদান করেও শিক্ষক পদে কর্মরত আছেন। সরোয়ার জাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে জমি ক্রয় না করে নিজের নামে ক্রয় করেছেন। এক ডজনের বেশি অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে দুজনের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান ভিসিকে তার অধীন মনে করে অশোভন আচরণ করতেন। এতে বলা হয়, খলিলুর রহমান ভিসিকে রেজিস্ট্রারের চেয়ে নিচের পদের মনে করতেন। তাই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
”আমি ২০২১ সালের ১ এপ্রিল ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নিই। তখন প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিলে বোর্ড অব ট্রাস্টি আমার পেছনে লাগে। এমনকি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যা দিয়ে এবং আমাকে তার সহযোগী ট্যাগ দিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়।”
— প্রফেসর মোজাম্মেল হক (সাবেক ভিসি)
অভিযোগ আছে, এই অভিযোগ দায়েরের জের ধরেই ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল বেআইনিভাবে ভিসি প্রকৌশলী মোজাম্মেল হককে অপসারণ করা হয়।
এর আগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিদের একক আধিপত্য ছিল। আওয়ামী লীগের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এবং চট্টগ্রাম-৮ আসনের সাবেক এমপি আবদুস সালামকে বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য করা হয়েছিল।
ভিসি নিয়ে টানাপোড়েনে বেকায়দায় পড়তে পারেন শিক্ষার্থীরা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেহেতু সরকার প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পরও ট্রেজারারকে ভিসি বানিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে—যা একটি অবৈধ প্রক্রিয়া—তাই তার সময়কালে দেওয়া অন্তত ২ হাজার সনদ বাতিল হতে পারে যেকোনো সময়। এতে বেকায়দায় পড়তে পারেন শত শত শিক্ষার্থী।
সরকারের নিয়োগ করা বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ফারুক বলেন, “সরকার আমাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। আমি দায়িত্ব পালন করতে চাইলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাইনি। ফলে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ হয়নি। এর পরিবর্তে তারা বিধি-বিধান উপেক্ষা করে নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একজনকে উপাচার্য (ভিসি) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। বিষয়টি সরকারের আইন অনুযায়ী তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
এসব বিষয়ে ইউজিসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে তিনি এ বিষয়ে পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরিচালকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব নাঈমা খন্দকার বলেন, “আমি নতুন দায়িত্বে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত নথিপত্র ও অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করা হবে। এরপর বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য সরোয়ার জাহান, সাবেক ট্রেজারার বর্তমানে ভিসি ড. শরীফ আশরাফুজ্জামান এবং জনসংযোগ কর্মকর্তা সাইদুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি সম্ভব হয়নি। পরে তাদের মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তারা কোনো সাড়া দেননি।

















