অপরাধচিত্র রিপোর্ট: চার বছরের শিশু সাইবা ছিল মায়ের হাতের কাছেই। গত ৩০ আগস্ট বনানী সৈনিক ক্লাবের সামনে ফুটওভার ব্রিজের গোড়ায় সাইবাকে দাঁড় করিয়ে মাত্র ৫ মিনিটের জন্য পাশের ফুটপাতে জুতা কিনতে যান মা বিথী আক্তার। ফিরে এসে দেখেন সন্তান নেই। তড়িঘড়ি করে বনানী থানায় ছুটে গেলেও পরপর দুদিন পুলিশ অভিযোগ না নিয়ে একরকম তাড়িয়ে দেয় রতভুক্তভোগী মা-কে। অবশেষ দুদিন পর ১ সেপ্টেম্বর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নেওয়া হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা স্পষ্ট জানিয়ে দেন—‘বাচ্চা খুঁজে বের করা পুলিশের কাজ নয়, অন্যান্য কাজ আছে।’
নিখোঁজ শিশু সাইবার মতো এমন অসংখ্য ভুক্তভোগী পরিবারের অভিজ্ঞতা প্রায় একই রকম। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সামাজিক সংগঠন ‘মুন অ্যালার্ট’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অন্তত দুই ডজন নিখোঁজ শিশুর স্বজনরা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে পুলিশের চরম অসহযোগিতা ও গাফিলতির এমন বহু চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে ধরেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা:
মিরপুরের শিশু ইব্রাহিম: গত ১৩ মে নিজ বাসার বিল্ডিং থেকে নিখোঁজ হয় শিশু মোহাম্মদ ইব্রাহিম। বাবা পেশায় ফুচকা বিক্রেতা। তিনি জানান, পল্লবী থানা প্রথমে জিডি না নিয়ে দুদিন ঘুরিয়ে ১৫ মে জিডি গ্রহণ করে। তদন্তের নামে ১৭ দিন ঘোরানোর পর মামলা স্থানান্তর করা হয় ডিবিতে। অসহায় বাবার আকুতি, “থানায় এতোবার গেছি যে মনে হয়েছে সন্তান হারিয়ে আমিই অপরাধী হয়েছি।”
সাবেক পুলিশ সদস্যের তামিম: ২০২৫ সালের ২০ মে স্কুলে যাওয়ার পথে হারিয়ে যায় শিশু তামিম। তামিমের বাবা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য মো. নজরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “নিজের বাহিনীতেই চাকরি করেছি, অথচ ১৬ মাস ধরে পথে পথে ঘুরেও কোনো সাহায্য পাইনি। সন্তানকে খুঁজতে গিয়ে পেনশনের ২৫ লাখ টাকা শেষ, আজ আমি নিঃস্ব।”
খুলনার সামিরা: গত বছরের ২৬ আগস্ট খুলনার কয়রা বাজার থেকে নিখোঁজ হয় শিশু সামিরা। জড়িত সন্দেহভাজন এক যুবককে স্থানীয়রা ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিলেও কয়রা থানা পুলিশ রিমান্ড বা কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ না করে তাকে ছেড়ে দেয়। শিশুটির মায়ের অভিযোগ, পুলিশের দায়িত্বহীনতার কারণেই মূল আসামি পার পেয়ে গেছে।
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য:
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গণি জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তা যাচাই-বাছাই করে দায়ী সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, শিশু নিখোঁজের বিষয়গুলো সংবেদনশীলতার সঙ্গে গুরুত্ব দেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। জিডি তদন্তে গাফিলতি বা অসৌজন্যমূলক আচরণের কোনো সুযোগ নেই। এমন ঘটনা ঘটলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিলম্ব এড়াতে তিনি নাগরিকদের ‘অনলাইন জিডি’ সুবিধা ব্যবহারেরও পরামর্শ দেন।
অ্যালার্ট জারি ও পরিসংখ্যান:
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনও নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ জন শিশু (প্রায় ১৩ শতাংশ)।
সংবাদ সম্মেলনে সামাজিক সংগঠন ‘মুন অ্যালার্ট’-এর প্রধান সমন্বয়কারী সাদাত রহমান বলেন, বিশ্বজুড়ে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় যে ধরনের তাৎক্ষণিক ও বিশেষ অ্যালার্ট ব্যবস্থা চালু রয়েছে, বাংলাদেশেও তা কার্যকর করা প্রয়োজন। নিখোঁজের পর দ্রুত পদক্ষেপ ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই শিশুদের উদ্ধার সুনিশ্চিত করা সম্ভব।


















