অপরাধচিত্র প্রতিনিধি: রাজধানীর মহাখালীতে দীর্ঘদিনের যানজট ও সড়ক দখলের চিত্র পাল্টাতে শুরু হয়েছে নতুন পরিবহন ব্যবস্থাপনা। দীর্ঘ সময় টার্মিনাল কিংবা সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা দূরপাল্লার বাসগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপোতে।
নতুন ব্যবস্থায় কোনো বাসের পরবর্তী ট্রিপে দীর্ঘ বিরতি থাকলে সেটি মহাখালীতে অপেক্ষা করবে না। বাসটি চলে যাবে পূর্বাচলের ডিপোতে। ট্রিপের নির্ধারিত সময়ের সর্বোচ্চ ৪৫ মিনিট আগে আবার মহাখালী টার্মিনালে এসে যাত্রী নিয়ে দ্রুত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মহাখালী এলাকায় যানজট ও সড়ক দখলের চিত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা।
পূর্বাচল ডিপোতে ৯১ বাস:
মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টা পর্যন্ত পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপোতে মোট ৭৪টি বাস প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে ১০টি বাস পরবর্তী ট্রিপের জন্য ডিপো ছেড়ে গেছে। নিয়মিতভাবে সেখানে অবস্থান করছে ৬৪টি বাস।
এর বাইরে আগে থেকেই ডিপোতে ছিল ২৩টি বাস। মহাখালী টার্মিনাল থেকেও নতুন করে চারটি আন্তঃজেলা বাস সেখানে পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে ডিপোতে রয়েছে ৯১টি বাস।
৩ থেকে ৮ ঘণ্টা বিরতির বাস যাবে ডিপোতে:
যেসব বাসের এক ট্রিপ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ট্রিপে যেতে ৩ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগে, সেগুলোকে মহাখালীতে রেখে না দিয়ে পূর্বাচলের ডিপোতে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিদিন প্রায় ১০০টি বাস ডিপোতে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২০০টি বাস রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। বাকি অবকাঠামোগত কাজ শেষ হলে আরও ৫০ থেকে ৬০টি বাস রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে যেসব বাসের পরবর্তী ট্রিপ ২ থেকে ৩ ঘণ্টার মধ্যে, সেগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের আগে টার্মিনালে প্রবেশ করতে পারবে।
প্রধান সড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা বন্ধ:
মহাখালী টার্মিনালের সামনের প্রধান সড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এখন নির্ধারিত কাউন্টার বা স্টপেজ থেকেই যাত্রী তুলতে হবে।
টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার পর বাসকে আর সড়কে দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলার সুযোগ থাকবে না। নিয়ম অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট বাস ও চালকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
ইতোমধ্যে নিয়ম ভেঙে প্রধান সড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার ঘটনায় কয়েকটি বাসকে কয়েক দিনের জন্য চলাচল থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে বদলের চিত্র:
বুধবার বিকেলে মহাখালী বাস টার্মিনাল এলাকায় দেখা যায়, সিরিয়াল অনুযায়ী বাসগুলো টার্মিনাল থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। প্রধান সড়কে ওঠার পর দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়নি বাসগুলোকে।
যাত্রী ওঠানোর পরপরই বাসগুলো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। ফলে টার্মিনালের সামনের সড়কে দীর্ঘক্ষণ বাস দাঁড়িয়ে থাকার চাপ কমতে শুরু করেছে।
মহাখালীতে থাকবে চলমান বাস:
দীর্ঘদিন ধরে মহাখালীর অন্যতম বড় সমস্যা ছিল দূরপাল্লার বাসের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সকালে ঢাকায় আসা অনেক বাস রাতের ট্রিপের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা টার্মিনাল ও আশপাশের সড়কে অবস্থান করত।
এতে সড়কের একটি বড় অংশ দখল হওয়ার পাশাপাশি সৃষ্টি হতো যানজট। বিমানবন্দরমুখী সড়কেও এর প্রভাব পড়ত।
নতুন ব্যবস্থায় দীর্ঘ বিরতিতে থাকা বাসগুলো মহাখালী ছেড়ে পূর্বাচল ডিপোতে থাকবে। নির্ধারিত সময়ের আগে আবার টার্মিনালে ফিরে এসে যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে যাবে।
এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয় ডিপো:
পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপোর কিছু কাজ এখনো শেষ হয়নি। অতিবৃষ্টিতে সেখানে রাখা বাস পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বাসকর্মীদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থাও পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি।
তবে অবকাঠামোগত কাজ শেষ হলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষমাণ বাসগুলোকে পূর্বাচলেই রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। মহাখালীতে মূলত চলমান বাসের যাত্রী ওঠানো-নামানো ও প্রয়োজনীয় অপারেশন চালু রাখার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
৭২ ঘণ্টার লক্ষ্য:
মহাখালীর যানজট ও সড়ক দখলের সমস্যা কমাতে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দূরপাল্লার বাসের অপেক্ষমাণ সময় কমানো, সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা বন্ধ করা এবং নির্দিষ্ট ডিপো ব্যবস্থাপনা কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সায়েদাবাদ-ফুলবাড়িয়াতেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা:
মহাখালীর পর রাজধানীর সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালেও একই ধরনের ব্যবস্থাপনা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।সায়েদাবাদের বাস ডিপো ব্যবস্থাপনা কাঁচপুর,এলাকায় নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের পাশে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত টিকিট কাউন্টার সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
টার্মিনালগুলো সংস্কার করে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে টিকিটিংসহ বিভিন্ন যাত্রীসেবা এক জায়গা থেকে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
১৫ জুলাই শুরু হয়েছিল স্থানান্তর:
মহাখালী থেকে পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপোতে বাস স্থানান্তরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় গত ১৫ জুলাই।
প্রথম দিকে ডিপোর অবকাঠামো, বাসকর্মীদের সুযোগ-সুবিধা এবং বৃষ্টির সময় বাস রাখার মতো কিছু সমস্যা সামনে আসে। ফলে কার্যক্রম ধাপে ধাপে এগিয়েছে।
এখন নতুন ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য—মহাখালীর সড়ককে অপেক্ষমাণ বাসের চাপ থেকে মুক্ত করে যান চলাচল আরও স্বাভাবিক করা।

















