সাতক্ষীরা মেডিকেলে ১০ লিফটের ৩টিও অচল, বারবার চিঠি দিয়েও সমাধান নেই
আবদুল্লাহ আল মামুন: সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা এস্কেলেটর আট বছরেও চালু হয়নি। স্থাপনের পর থেকেই পড়ে থাকা এই মূল্যবান যন্ত্রটি এখন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। একই হাসপাতালে থাকা ১০টি প্যাসেঞ্জার লিফটের মধ্যে তিনটিও বর্তমানে অচল। ফলে প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা নিতে আসা বিপুলসংখ্যক রোগী ও স্বজনের পাশাপাশি চিকিৎসক-নার্সদেরও চলাচলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের দিকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি এস্কেলেটর ও ১০টি প্যাসেঞ্জার লিফট স্থাপন করা হয়। কিন্তু এস্কেলেটরটি স্থাপনের পর থেকে আজ পর্যন্ত চালু হয়নি। অন্যদিকে সচল থাকা প্যাসেঞ্জার লিফটগুলোর মধ্যেও তিনটি বর্তমানে বিভিন্ন ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে—প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা একটি সরকারি যন্ত্র আট বছর ধরে কেন পড়ে আছে? স্থাপনের পর থেকেই যদি এটি চালু না হয়ে থাকে, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই হয়েছিল কি না?
বারবার চিঠি, তবু নেই কার্যকর উদ্যোগ:
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কুদরত-ই খোদা জানান, এস্কেলেটরটি চালু এবং বন্ধ থাকা তিনটি প্যাসেঞ্জার লিফট মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গত ৫ জুলাই ২০২৬ তারিখেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে এস্কেলেটর চালু, তিনটি লিফট মেরামতসহ হাসপাতালের ১১টি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
হাসপাতাল পরিচালক বলেন, প্রায় ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও ভর্তি রোগী মিলিয়ে দেড় থেকে দুই হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। এর মধ্যে তিনটি লিফট বন্ধ থাকায় রোগী ও স্বজনদের পাশাপাশি চিকিৎসক-নার্সদেরও চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সরকারি অর্থে স্থাপন করা এস্কেলেটরটি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৫৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা:
সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রোপার্টিজ ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের মাধ্যমে প্রায় ৫৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এস্কেলেটরটি স্থাপন করা হয়।
তবে স্থাপনের পর থেকেই এটি কেন চালু করা সম্ভব হয়নি, সেই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি।
‘১০টি লিফটের পর এস্কেলেটর কতটা প্রয়োজনীয় ছিল?’
বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা খুলনা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এ.কে. হাসানুজ্জামান জানান, তিনি প্রায় পাঁচ মাস আগে খুলনায় যোগ দিয়েছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পেরেছেন, হাসপাতালে ১০টি প্যাসেঞ্জার লিফট থাকা অবস্থায় এস্কেলেটর স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, এস্কেলেটরটির বর্তমান অবস্থা ইলেকট্রিশিয়ান ও টেকনিশিয়ানের মাধ্যমে পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বন্ধ থাকা তিনটি প্যাসেঞ্জার লিফট এবং অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণ কাজও দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তদন্তসাপেক্ষে স্পষ্ট হতে পারে আট বছরের রহস্য
একদিকে প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা এস্কেলেটর আট বছর ধরে চালু হয়নি, অন্যদিকে একই হাসপাতালে ১০টি লিফটের মধ্যে তিনটি বর্তমানে অচল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বারবার চিঠি দিয়েও তারা কার্যকর সমাধান পাচ্ছে না। আবার প্রকৌশল বিভাগের পক্ষ থেকে এস্কেলেটর স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ফলে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ, নকশা ও স্থাপনের সিদ্ধান্ত, কারিগরি সক্ষমতা, গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা এবং দীর্ঘদিন চালু না হওয়ার প্রকৃত কারণ—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি অর্থে স্থাপিত মূল্যবান যন্ত্রপাতি যাতে অব্যবহারে নষ্ট না হয়, সে জন্য দ্রুত কারিগরি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, আট বছর ধরে বন্ধ থাকা এস্কেলেটর এবং অচল লিফটগুলো কবে নাগাদ সচল হয়।


















