রংপুর প্রতিনিধি :
প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে এসে মারা যাওয়া ভারতীয় নাগরিক প্রবীর মণ্ডলের মরদেহ গত ৫ বছর ধরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে। আইনি জটিলতা, স্বজনদের অনাগ্রহ এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের অভাবে মরদেহটি এখনও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। এদেশে দাহ করার উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রবীর মণ্ডলের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নিমচা মৈত্রী স্ট্রিটের এম আলম বাজার এলাকায়। তার বাবার নাম মহাদেব মণ্ডল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে বাংলাদেশের এক নারীর সঙ্গে প্রবীরের পরিচয় হয়। পরে সেই পরিচয় প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়। একই বছরের নভেম্বর মাসে ওই নারীর সঙ্গে দেখা করতে তিনি লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রামে আসেন।
সেখানে আজিজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে অবস্থানকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন প্রবীর। স্থানীয়রা দ্রুত পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় পাটগ্রাম থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়।
মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের জন্য তার মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ২০২১ সালের ১০ নভেম্বর একটি মেডিক্যাল বোর্ডও গঠন করা হয়। কিন্তু এরপর কেটে গেছে ৫ বছর, এখনও সেই মরদেহ হাসপাতালের হিমঘরেই সংরক্ষিত রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রবীর মণ্ডলের পোশাক থেকে উদ্ধার হওয়া ভারতীয় পাসপোর্টে দেখা যায়, তিনি ২০১৭ সালের ৩ মার্চ তিন মাসের ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং ২০১৮ সালের ১৬ মার্চ বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে ফিরে যান। তবে এরপর কীভাবে তিনি আবার বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে হিমঘরের দায়িত্বে থাকা এক ডোম নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বৈদ্যুতিক বিপর্যয়সহ নানান কারণে লাশটি পচন ধরতে শুরু করেছে। এখন অবস্থা এমনি পর্যায়ে উপনীত হয়েছে লাশটি পুরোপুরি বিকৃত হয়ে গেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে ২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরে পাঠানো এক চিঠিতে বিজিবি ও বিএসএফের পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে লাশ ভারতে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়। তবে সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়ন হয়নি।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম থানার ওসি রমজান আলী বলেন, প্রবীর মণ্ডলের পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত লাশ নিতে আগ্রহ দেখায়নি।
রংপুরের জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন বলেন, প্রবীর মণ্ডলের মৃত্যুর সময় দেশে-বিদেশে করোনা মহামারির প্রভাব ছিল। সে সময় সীমান্তে কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সম্ভবত মরদেহ গ্রহণে আগ্রহী হয়নি।
হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মরদেহটি মর্গে পড়ে থাকলেও বিষয়টি নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে ওঠেনি। ফলে মরদেহটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর কিংবা স্থানীয়ভাবে শেষকৃত্যের কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

















