অপরাধচিত্র প্রতিবেদক: আষাঢ়ের অঝোর বৃষ্টি শেষে খুলনার আকাশে সূর্য ছড়াচ্ছিল তাপ। এমন রোদের মধ্যে নদীর পাড়ে দূর্বাঘাসে গা এলিয়ে বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিলেন বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কায়েম আলী বিশ্বাস (৯০)। মোটা চশমার ফাঁক দিয়ে কায়েম আলীর দৃষ্টি নিবিষ্ট বড়শির দিকে। স্থানটি খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার গঙ্গারামপুর ইউনিয়নের আমতলী নদীর পাড়।
বৃদ্ধের মনোযোগ ভাঙল এই প্রতিবেদকের ডাকে। কয়টি মাছ ধরলেন, জানতে চাইলে থলের ভেতর থাকা তিনটি ট্যাংরা মাছ দেখিয়ে বললেন, ‘এতে আমাদের বুড়ো-বুড়ির (স্বামী-স্ত্রী) হয়ে যাবে।’ পরক্ষণেই তিনি বলেন, ‘মাছ ধরতে ভয় লাগে। শুনেছি নদী বিক্রি করে দিয়েছে।’
২০২৩ সালে আমতলা নদী ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা দিয়ে দেয় খুলনা জেলা প্রশাসন। এর পর থেকে এ নদীতে মাছ ধরা, পানির ব্যবহার কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অথচ বছরের পর বছর ধরে এই নদীর মাছ খেয়ে আসছেন এই এলাকার মানুষ। এই নদীর জলে চাষাবাদ হয় প্রায় ২০ হাজার বিঘা কৃষিজমির। ফসল নিয়ে ফেরাও এই নদী হয়েই।
কায়েম আলীর পাশেই বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিলেন গঙ্গারামপুর ইউনিয়নের সুখদাড়া গ্রামের উত্তম সেন। তিনি বলেন, এই নদী থেকে মাছ ধরেই সংসার চলত। এই নদীর পানি দিয়ে চাষবাস হতো। তাঁদের অস্তিত্ব এই নদী ঘিরেই। ইজারা দেওয়ার পর থেকে নদীতে আর মাছ ধরা যাচ্ছিল না।
সম্প্রতি অতিবৃষ্টিতে নদীতে ইজারাদারদের দেওয়া নেটপাটায় (মাছ চাষের জন্য দেওয়া ঘেরা বেড়া) পানি আটকে এলাকা ডুবে গেলে স্থানীয় লোকজন একজোট হয়ে সে নেটপাটা তুলে নেন। এরপর মাছ ধরাও শুরু করেন।
গত মঙ্গলবার আমতলা ব্রিজ থেকে নেমে নদী ঘেঁষে চলে যাওয়া ইটের সড়ক ধরে ঘুরে যায় কিছু দূর পরপর নদীতে নেটপাটা। নদীর মাঝখানে একটি টিনের ঘর চোখে পড়ল। স্থানীয় লোকজন জানালেন, এই ঘর থেকে নদী পাহারার ব্যবস্থা করেছেন ইজারাদার। ওই সময় অবশ্য টিনের ঘরে কোনো পাহারাদার দেখা যায়নি। স্থানীয় লোকজন জানান, কলাতলা থেকে আমতলা পর্যন্ত ৯ কিলোমিটারজুড়ে এ নদীর দুই পারে আছে ১৬টি গ্রাম।
আমতলা নদীতে স্থানীয়দের অধিকার রক্ষায় আন্দোলন করতে গিয়ে প্রভাবশালীদের মামলায় ২০০৮, ২০১০, ২০১৩ সালে তিনবার জেল খেটেছেন বটিয়াঘাটা খাল-নদী রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিভাস মন্ডল। তিনি বলেন, ইজারাদারেরা নদীতে বাঁশ দিয়ে নেটপাটা তৈরি করে নদী পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করেন। আমনের সময় সে কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে ফসলের ক্ষতি হয়। আবার বোরো মৌসুমে স্লুইসগেট দিয়ে লবণ–পানি ঢুকিয়ে ফসলের ক্ষতি করেন। মাত্র এক লাখ টাকার ইজারার বিনিময়ে হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকাকে সংকটগ্রস্ত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বটিয়াঘাটা উপজেলার আমতলা নদী পুরো এলাকার কৃষি, পানিনিষ্কাশন ও মৎস্য সম্পদের প্রাণরেখা। খড়িয়া, বটবুনিয়া, বরাখালী, ছোটখড়িয়া, মরাখড়িয়া, গোন্ধামারী ও বটিয়াঘাটা খাল এই নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। এই নদীর মাধ্যমে উপজেলার অন্তত ৩৭টি গ্রামের প্রায় ৪৫ হাজার একর কৃষিজমির পানিনিষ্কাশন হয়। নদীর পানি ব্যবহার করে কৃষকেরা আমন, আউশ ও বোরো ধান, তরমুজ, কুমড়া, তিল, মুগ ডালসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করেন। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকার বড় অবলম্বনও এই নদী। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল।
আগে আমতলা নদী উন্মুক্ত থাকায় কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে এটি ব্যবহার করতেন। কিন্তু ১৯৮৫ সালে জলমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়া শুরু হলে পরিস্থিতি বদলে যায়। ইজারাদারদের কারণে সাধারণ মানুষের নদীতে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি লবণপানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ি চাষের সুযোগ তৈরির অভিযোগ ওঠে, যার প্রভাব পড়তে থাকে কৃষিজমি ও পরিবেশে। এতে কৃষক ও মৎস্যজীবীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ে।
এ অবস্থায় এলাকার মানুষ ২০০৬ সালে তৎকালীন ভূমিমন্ত্রীর কাছে এবং ২০০৭ সালে জেলা প্রশাসকের কাছে আমতলা নদীসহ সংযুক্ত খালগুলোর ইজারা বাতিল করে এগুলো উন্মুক্ত জলাশয় ঘোষণার দাবি জানান। এরপর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একাধিকবার তদন্তের পর বিভিন্ন স্থানের অবৈধ নেটপাটা ও বাঁধ অপসারণ করা হয়। এর মধ্যেই আবার ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় লোকজন আদালতের শরণাপন্ন হন। ২০১০ সালে আদালতের আদেশে ইজারা-সংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিত হয়। স্থানীয় লোকজন জানান, এরপর দীর্ঘদিন উন্মুক্ত থাকায় এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ায় ২০২২ সালে মামলাটিও প্রত্যাহার করা হয়।
প্রায় ১২ বছর উন্মুক্ত থাকলেও ২০২৩ সালে খুলনা জেলা প্রশাসন আমতলা নদীকে ৬০ একর আয়তনের ‘বদ্ধ জলাশয়’ দেখিয়ে গঙ্গারামপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে বার্ষিক ১ লাখ ১০ হাজার টাকা ইজারামূল্যে ছয় বছরের জন্য বন্দোবস্ত দেয়। এরপর নদীর বিভিন্ন স্থানে আড়াআড়িভাবে বাঁশের পাটা বসানো হয়। এতে আমতলা নদীর দুই প্রান্তের স্লুইসগেট এবং মাঝামাঝি খেজুরতলা গেট দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
ইজারাদার সুধীর সরদার অসুস্থ থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া যায়নি। স্থানীয় লোকজন বলছেন, ইজারাদার হিসেবে সুধীর সরদারের নাম থাকলেও তাঁর পেছনে ছিলেন খুলনা জেলা পরিষদের তৎকালীন প্রশাসক ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হারুনুর রশিদ। তিনি এখন পলাতক।
১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ২০ ধারায় বলা হয়েছে, নদী ও নৌপথ যা (সমষ্টির সম্পত্তি) হিসেবে রেকর্ডভুক্ত, সেগুলো ব্যক্তির হাতে মালিকানা দেওয়া যাবে না। ২০১৯ সালে হাইকোর্টের এক রায়ে নদীকে জীবন্ত সত্তা স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু সব আইন অমান্য করে আওয়ামী লীগ আমলে দেওয়া ইজারা এখনো বহাল রেখেছে খুলনা জেলা প্রশাসন।
১৩ জুলাই আমতলা নদী পরিদর্শনে যান খুলনার জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত। এলাকাবাসী বলছেন, জেলা প্রশাসক বিষয়টি তদন্ত করে ইজারা বাতিলের আশ্বাস দিয়েছেন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ১৪ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত তাঁর মুঠোফোনে বারবার কল দিলেও তিনি ফোন ধরেননি, খুদে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি। পরবর্তীকালে কার্যালয়ে গেলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
জেলা প্রশাসনের ইজারার নথিপত্রে আমতলা নদী হিসেবেই উল্লেখ রয়েছে। তবে তার সঙ্গে ব্র্যাকেটে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ‘বদ্ধ জলাশয়’। এভাবে নদীকে ইজারা দেওয়ার প্রশাসনিক কৌশলের অভিযোগ বহু পুরোনো। নদী–গবেষক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, নদীতে বাঁধ দিয়ে প্রবাহ নষ্ট করা হয়। ফলে নদী তার চিরন্তন চরিত্র হারিয়ে বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়। তিনি বলেন, যাঁরা নদী ইজারা দেন, তাঁরা সচেতনভাবে আইন লঙ্ঘন করেন। তাঁদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না হলে এ ইজারা দেওয়া বন্ধ হবে না।


















