অপরাধচিত্র ডেস্ক: ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রয়েছেন মিজানুর রহমান
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রয়েছেন মিজানুর রহমানছবি: মানসুরা হোসাইন
মিজানুর রহমান গত ১৪ জুন থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রয়েছেন। ভর্তির দুই দিন পরই তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
২৫ জুলাই, শনিবার হাসপাতালের আইসিইউর সামনে বসে মিজানুর রহমানের মা মাতোয়ারা বেগম বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তির পর দুই দিন খালি “ও-মা” বলে ডাকছে। তারপর তো ছেলের দিনদুনিয়ার আর কোনো খেয়ালই নাই। মাকেও চেনে না। সম্পূর্ণ শরীরই তো প্যারালাইজড।’
সম্প্রতি মিজানুর রহমানের একটি ছবি ফেসবুকে ছড়িয়েছে। সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তাঁর গলায় একটি মোটা পাইপ লাগানো, নাকে নল। শুয়ে থাকা মিজানুরের ডান হাতে মোটা দড়িসহ হাতকড়া লাগানো। অথচ হাতটির আঙুলে অক্সিমিটার রয়েছে।
মিজানুর রহমানের স্ত্রী সালমা জাহান বলেন, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ছবিটি তাঁর স্বামীর ছবি। তবে আইসিইউ থেকে কে বা কীভাবে ছবিটি ছড়িয়ে পড়েছে, তা তিনি বা পরিবারের সদস্যরা জানেন না।
মিজানুর রহমান পটুয়াখালী সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পটুয়াখালী জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। তাঁর স্ত্রী সালমা জাহান পটুয়াখালী সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, তিনি জেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।
সালমা জাহান বলেন, ‘গত সপ্তাহের সোমবার চিকিৎসক যখন জানায় যে আমার স্বামীর অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে, তখন অনুরোধ করলে পুলিশ তার হাত থেকে হাতকড়া খুলে দেয়। এর আগে অনেকবার এটি খুলতে বললে দায়িত্বরত পুলিশ শুধু বলেছে, খোলার নিয়ম নেই।’
অর্থাৎ এক মাস এই আইসিইউতে হাতকড়া নিয়েই ছিলেন মিজানুর রহমান। মিজানুর রহমান (৪৮) পটুয়াখালী সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পটুয়াখালী জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর পটুয়াখালীতে মিজানুরের বাড়িতে হামলা হয়েছিল।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে মিজানুর রহমানের মা মাতোয়ারা বেগম
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে মিজানুর রহমানের মা মাতোয়ারা বেগমছবি: মানসুরা হোসাইন
মিজানুর রহমান খুন, হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলার আসামি। ঢাকার পল্টন থানার একটি মামলায় ১১ মাস আগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে ছিলেন।
সালমা জাহান জানান, গত ৯ জুন কাশিমপুর কারাগারে মিজানুর রহমান অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবে কারা কর্তৃপক্ষ কোনো খবর দেয়নি। সেখানে থাকা পরিচিত এক আসামির আত্মীয়ের মাধ্যমে খবরটি জানতে পারেন।
ছেলের তো দিনদুনিয়ার কোনো খেয়ালই নাই। মাকেও চেনে না। সম্পূর্ণ শরীরই তো প্যারালাইজড।
মাতোয়ারা বেগম, মিজানুর রহমানের মা
মিজানুর রহমানকে প্রথমে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল হয়ে আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয় তাঁকে। তারপর নেওয়া হয় আইসিইউতে।
সালমা জাহান বলেন, ‘আমার স্বামী এক মামলায় জামিন পান, আবার আরেক মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্যই এমন জুলুম করা হচ্ছে। এই দিকে আমার স্বামী বাঁচবে কি না, তারই তো ঠিক নেই। আমরাও শারীরিক, মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছি।’
মিজানুর রহমান পাঁচ বোনের একমাত্র ভাই। ২০ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবার তাঁর ওপরই নির্ভরশীল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউর সামনে মেঝেতে পাটি বিছিয়ে মিজানুর রহমানের মা, স্ত্রী, বোনসহ স্বজনেরা পালা করে থাকছেন।
মিজানুর রহমানকে গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর একটি হত্যা মামলায় ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ মামলার এজাহারে তাঁকে ‘সন্দিগ্ধ আসামি’ উল্লেখ করা হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী সালমা জাহানও তিনটি মামলায় পটুয়াখালী জেলা কারাগার এবং কাশিমপুর মহিলা কারাগারে ছিলেন ছয় মাস। এখন জামিনে মুক্ত আছেন। তিনি পটুয়াখালী সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং জেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।
মিজানুর রহমানকে গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর একটি হত্যা মামলায় ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর পর থেকে কারাগারে রয়েছেন তিনি। গত ৯ জুন কাশিমপুর কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে তিনি এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের আইসিইউতে রয়েছেন। অন্যদিকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা অবস্থাতেই একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় মিজানুর রহমানকে।
ঢাকার আদালতে মিজানুর রহমানের আইনজীবী এইচ এম সারোয়ার হোসেন জানান, এ পর্যন্ত পটুয়াখালী ও ঢাকায় মোট আটটি মামলায় জামিন পেয়েছেন মিজানুর। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি থাকার সময় গত ২৩ জুন আবার আরেক মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে তাঁকে আদালতে তলব করা হয়েছিল। এখন ৩০ জুলাই ভার্চ্যুয়ালি শুনানির আদেশ হয়েছে।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানছবি: পরিবারের সৌজন্যে
‘এই রোগী পালানোর মতো অবস্থায়ই নেই’
ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের আইসিইউতে দায়িত্বপ্রাপ্ত একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই চিকিৎসকেরা বলেন, এই রোগী লাইফ সাপোর্টে আছেন। বাঁচবেন কি না, তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। কয়েকবারই অবস্থা খুব খারাপ হয়েছে, তখন পরিবারের সদস্যদের মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রাখতেও বলা হয়। আইসিইউর সামনে তিন দফায় বেশ কয়েকজন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। রোগীর হাতকড়া খুলে দিতে তাঁদের বলা হলেও ‘নিয়ম নেই’ জানিয়ে তাঁরা খুলছিলেন না।
আইসিইউতে হাতে হাতকড়া থাকায় ক্যানুলা লাগানোসহ চিকিৎসায় বিঘ্ন হয়েছে। হাতকড়ার রশিটিও জীবাণুমুক্ত করা হয়নি সেভাবে। আর সব থেকে বড় কথা, এই রোগী পালানোর মতো অবস্থাতে নেই সেই শুরু থেকেই।
চিকিৎসক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
গত শনিবার দুপুরে আইসিইউর সামনে দায়িত্বরত একাধিক পুলিশ সদস্যের কাছে হাতকড়া পরানো নিয়ে জানতে চাইলে তাঁরা শুধু বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ পালন করেন তাঁরা। নিজে থেকে হাতকড়া খোলার এখতিয়ার তাঁদের নেই।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হাতকড়া মূলত আসামি যাতে পালাতে না পারে বা নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আসামিদের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকেরা এ নিয়ে আপত্তি করলে তা খুলে দেওয়া হয়।
আইসিইউর দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের একজন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইসিইউতে হাতে হাতকড়া থাকায় ক্যানুলা লাগানোসহ চিকিৎসায় বিঘ্ন হয়েছে। হাতকড়ার রশিটিও জীবাণুমুক্ত করা হয়নি সেভাবে। আর সব থেকে বড় কথা, এই রোগী পালানোর মতো অবস্থাতে নেই সেই শুরু থেকেই। আইসিইউতে রোগীর হাতে হাতকড়া লাগানো বিষয়টি খুবই অমানবিক।’
মিজানুর রহমান আইসিইউ থেকে পালাতে পারবেন কি না—এমন প্রশ্নে মহাপরিদর্শক সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, ‘অসুস্থ কোনো ব্যক্তির হাতে হাতকড়া থাকবে, আমরাও এটা প্রত্যাশা করি না। তবে আমাদের এখনো কিছু দুর্বলতা তো আছেই। কারাবন্দীদের বিভিন্ন হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। নিরাপত্তার প্রশ্নটি থেকেই যায়। হাসপাতালে এই আসামিদের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্তরাও নানা দ্বিধার মধ্যে থাকেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের হাতকড়া পরানোর ক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহার করা যাবে না, ২০১৮ সালের ৩ জুলাই এ রায় দেন হাইকোর্ট। হাতকড়া পরানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদেরও সতর্কও থাকতে বলা হয়।
আদালতে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করা আইনজীবী আবু ওবায়দুর রহমান তখন গণমাধ্যমে বলেছিলেন, হাতকড়া পরানোর ক্ষেত্রে পুলিশ প্রবিধান বা পিআরবির বিধান মেনে চলা উচিত। এই বিধানের বাইরে গিয়ে কাউকে হাতকড়া পরালে তা হবে মানবাধিকারের লঙ্ঘন।


















